Monday, October 26, 2020
টপ নিউজরাজশাহী

সোনালী আঁশ দুর্গাপুরের চাষিদের গলার ফাঁস

330views

সোনালী আঁশ দুর্গাপুরের চাষিদের গলার ফাঁস

সোনালী আঁশ দুর্গাপুরের চাষিদের গলার ফাঁসদুর্গাপুর প্রতিনিধি: আট বছর থেকে পাটচাষে ধরাশায়ী হচ্ছেন দুর্গাপুরের কৃষকরা। পাটচাষ করতে গিয়ে আট বছর থেকে সব হারিয়ে নিঃস্ব হতে বসেছেন দুর্গাপুর উপজেলার সাধারণ কৃষকরা। লাভের মুখতো দেখছেই না বরং প্রতিবছর তাদের গুনতে হচ্ছে লোকসানের হিসেব। এবারও রাজশাহীর দুর্গাপুরে পাটচাষিদের লোকসান সাড়ে ৫ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন চাষীরা। বিগত ২০১১ সালের পর থেকে প্রতিবছরে লাভের বদলে লোকসান হওয়ায় পাটচাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন এই অঞ্চলের কৃষকরা। একারণে প্রতি বছর কমছে পাটচাষের আবাদী জমির পরিমান। বলা যায় সোনালী আঁশ দুর্গাপুরের চাষিদের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দুর্গাপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, পাট একটি অর্থকারী লাভজনক ফসল। বাংলাদেশে পাটকে সোনালী আঁশ বলা হয়। ২০১১ সালের পূর্ব সময়ে সোনালী আঁশ পাটচাষে কৃষকরা লাভবান হওয়ায় সোনালী আঁশে সোনালী স্বপ্ন বুনেছেন এই অঞ্চলের চাষীরা। বিগত সময়ে কৃষকের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটিয়েছে সোনালী আঁশ পাট। কিন্তু কালের বিবর্তনে বিগত ২০০৮ সালের পর থেকে সোনালী স্বপ্ন দেখানো সোনালী আঁশ বর্তমানে কৃষকদের সর্বশান্ত, নিঃস্ব করে ফেলেছে এই অঞ্চলের কৃষকদের। এবারের ২০১৮ সালে পাটচাষে সাড়ে ৫ কোটি টাকা লোকশান হওয়ার আশংকা করছেন চাষীরা। প্রতি বছর লোকসান হওয়ায় পাটচাষে কৃষকদের জন্য অশনি সংকেত বলে মনে করছেন অনেকচাষিরা।

দুর্গাপুর উপজেলার বাশাইল গ্রামের পাটচাষী সোহাগ ইসলাম খোকন, রাজন, রফিকুল, নওশাদ আলী বলেন, এই অঞ্চলে পাটচাষ এখন কৃষকদের গলার কাঁটায় পরিনত হয়েছে। বিগত ১০ বছর থেকে পাটচাষে লোকসান গুনতে গুনতে নি:স্ব প্রায় দুর্গাপুর উপজেলার পাটচাষীরা। দুর্গাপুর পৌর সদরের সিংগা গ্রামের পাটচাষী আবু বাক্কার বলেন, পাটবীজ, সার, কীটনাশক, পানি সেচ, কৃষি শ্রমিকের মূল্য প্রতি বছর বেড়েই চলেছে। সে অনুপাতে বাড়েনি পাটের উৎপাদন ও বাজার মূল্য। সরকার এই বছর ঘোষণা দিয়েছিলো দেশে শতভাগ পাটজাত পণ্যের ব্যবহার নিশ্চিত করবে সেই সাথে দেশের বাইরে পাট রপ্তানীর ক্ষেত্রে উদ্যোগ নিবে। সেক্ষেত্রে পাটের দাম বাড়বে শতভাগ নিশ্চিত এমন ঘোষণা দিয়েছিলেন সরকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর এমন ঘোষণায় লাভের আশায় এই অঞ্চলের কৃষকরা এবার পাট চাষ করেছেন। পাট চাষে এবার খরচ হয়েছে গতবারের চেয়ে বেশী। খরা মৌসুমের কবলে উৎপাদন তুলনামূলক গতবারের মতোই হয়েছে। কিন্তু বাজারে দাম পাচ্ছে না কৃষকরা।

দুর্গাপুর বাজারে পাট বিক্রি করতে আশা উপজেলার কাশেমপুর গ্রামের পাটচাষী রহমত আলীর সাথে কথা হয়। তিনি বলেন, বর্তমানে পাট চাষ কৃষকদের গলার কাঁটায় রুপ নিয়েছে। পাটচাষে লোকশান হলেও এই অঞ্চলের চাষীরা লোকসান মেনে নিয়েই পাটচাষ করছেন। এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, পানবরজের ক্ষেত আছে বলে এই অঞ্চলের কৃষকরা দুবেলা দুমুঠো ভাত খেয়ে বেঁচে আছে। আর সেই পানবরজের জন্য পাটকাঠির ব্যবহার থাকায় পানচাষীরা লোকশানকে মেনে নিয়ে পাটচাষ করে চলেছেন। তিনি আরো বলেন, জমির খাজনা, জমিতে চাষ, মই, বীজ বপন, সার ও কীটনাশক ব্যবহার, নিড়ানী, সেচ, পাটকাঁটা, পানিতে ডুবিয়ে পাট পঁচানো, পাটকাঠি থেকে আঁশ ছড়ানো, ধৌত করা, শুকানো, পরিবহন দিয়ে বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করা পর্যন্ত একবিঘা ব্যয় হয় প্রায় ৯ থেকে ১০হাজার টাকা। এক বিঘা জমিতে পাট উৎপাদন হয় গড়ে ৪ থেকে ৫মন।

বাজারে প্রকার ভেদে পাট বিক্রি হচ্ছে ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা প্রতি মন। এক বিঘা জমির পাট বিক্রি হচ্ছে ৭ থেকে সাড়ে ৭হাজার টাকায়। প্রতি বিঘা পাটচাষে কৃষকদের লোকশান হচ্ছে প্রায় ৫হাজার টাকা। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর সূত্রে জানাগেছে, এই বছরে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করেছিলো ১৮৭০ হেক্টর কিন্তু অর্জিত হয়েছে ৯৩৬ হেক্টর। এক বিঘায় ৫হাজার টাকা লোকশান হলে প্রতি হেক্টরে লোকশান হচ্ছে ৬০হাজার টাকা। ১৮৭০ হেক্টরে কৃষকদের লোকশান গুনতে হচ্ছে ১১ কোটি ২২ লক্ষ টাকা। এই বছর সরকারের প্ররোচনায় পড়ে কৃষকরা সর্বস্ব হারিয়ে নি:স্বপ্রায়। এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেজাউল বলেন, পাটে খরচের তুলনায় দাম না পাওয়ায় লোকসানের মুখে রয়েছে চাষীরা। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে পাট চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে চাষীরা।

Leave a Response