Wednesday, October 28, 2020
টপ নিউজরাজনীতিরাজশাহী

সীমাহীন ব্যর্থতাতেই বুলবুলের ভরাডুবি

234views

সীমাহীন ব্যর্থতাতেই বুলবুলের ভরাডুবি

bulbulনিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিপুল ভোটে আওয়ামীলীগের প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের জয়ের পেছনে বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে সাবেক মেয়র বিএনপির প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের সীমাহীন ব্যর্থতা। মেয়র থাকাকালে তার উন্নয়নে ব্যর্থতা, নেতা কর্মীদের মন জয় করতে না পারা, বিএনপির দলীয় কোন্দল লিটনের পক্ষে বেশ শক্তভাবেই কাজে লেগেছে বলে মনে করছেন সাধারণ ভোটাররা। সেই সাথে খায়রুজ্জামান লিটনের পরিকল্পিতভাবে নির্বাচনি বৈতরনি পার করা বুলবুলর ভরাডুবি ঘটিয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। গত নির্বাচনে নিজেদের ভুলগুলো সুধরে এবারে পরিকল্পিতভাবে মাঠে নামে আওয়ামীলীগ। বিএনপি জামায়াতের অপপ্রচার রোধেও বেশ সচেতন ছিলেন আওয়ামীলীগ নেতা কর্মীরা। এর পাশাপাশি খায়রুজ্জামান লিটন ও মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল মেয়র থাকাকালিন সময়ে যে উন্নয়ন করেছেন তার তুলনা করতে গিয়ে সচেতন মানুষ আস্থা রাখেন লিটনের নৌকায়।

আওয়ামীলীগ নেতা এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ও বিএনপি নেতা মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের এটা তৃতীয়বার মুখোমুখি হওয়া। প্রথম প্রতিদ্বন্দিতা হয় ২০০৮ সালে। ঐ নির্বাচনে ২৩ হাজার ৮১০ ভোটে বুলবুলকে পরাজিত করে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন লিটন। ২০১৩ সালের ১৫ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দ্বিতীয়বার প্রতিদ্বন্দিতা হয় লিটন ও বুলবুলের। এই নির্বাচনে লিটনকে ৪৭ হাজার ৩৩২ ভোটে পরাজিত করে মেয়র হন বুলবুল। আর এবারে তৃতীয়বার মুখোমুখি হয়ে ভরাডুবি হয়েছে বুলবুলের। রাজশাহীর নতুন নগরপিতা হলেন খায়রুজ্জামান লিটন। রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ঘোষিত ফলে বিদায়ী মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে দ্বিগুণের বেশি ভোটে হারিয়েছেন সাবেক মেয়র এএইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন। ঘোষিত ফলাফল আনুযায়ি আওয়ামী লীগের প্রার্থী খায়রুজ্জামান লিটন নৌকা প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ৬৫ হাজার ৯৬ ভোট। আর বিএনপির বুলবুল ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ৭৭ হাজার ৭০০ ভোট।

বিভিন্ন সূত্র বলছে, এবারের নির্বাচনে লিটনের সহজ জয় আর বুলবুলের ভরাডুবির পেছনে বিভিন্ন দিক থেকে বুলবুলের পিছিয়ে থাকা কাজ করেছে। তার মধ্যে অন্যতম নগরীর উন্নয়নে বুলবুলের তেমন ভূমিকা রাখতে না পারা। আগের পাঁচ বছর মেয়র থাকাকালে খায়রুজ্জামান লিটন নগরীর উন্নয়নে যে কাজ করেছেন সেই তুলনায় বুলবুল চরমভাবে পিছিয়ে পড়েন। নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে বুলবুল বেশ সমালোচনার শিকার হন। যদিও বুলবুল বরাবরই অভিযোগ করেছেন তিনি সরকারের অসহযোগিতার শিকার হয়েছেন। তবে, সচেতন নাগরিকরা এটিকে ভালোভাবে নেয়নি। বরং সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সাথে ভালো সম্পর্ক করতে না পারার জন্য বুলবুলকেই দায়ি করেন তারা। এর পেক্ষিতে অনেকেই বলেন বিএনপি নেতা মিজানুর রহমান মিনুও বিরোধীদলে থাকাকালে মেয়র ছিলেন, কিন্তু সবার সাথে সুসম্পর্ক রেখে তিনি নগরীর উন্নয়নে যেভাবে কাজ করেছেন বুলবুল তা করতে পারেননি। এটিকে বড় অযোগ্যতা হিসেবেই দেখেন অনেকেই। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার কয়েকমাস আগেই খায়রুজ্জামান লিটন মেয়র প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে দলীয় প্রধানের কাছ থেকে সবুজ সংকেত পান। এর পরই মাঠ সাজাতে শুরু করেন তিনি।

ঐ সময় থেকেই লিটন বলেন, এক মেয়াদে মেয়র থাকার সময় তিনি যে উন্নয়ন করেছেন তা দৃশ্যমান। নগরবাসী তা মনে রেখেছে। কাজেই উন্নয়নের কথা ভেবেই মানুষ আবারো তাকে ভোট দিবেন বলে আশাবাদি ছিলেন তিনি। গত নির্বাচনে পরাজয়ের কারণগুলো চিহ্নিত করেন লিটন। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে মাঠে নামেন। গত নির্বাচনে লিটন ও তার সমর্থক কর্মীদের ছিলো অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস। মেয়র থাকাকালে এত উন্নয়নের পরও লিটনকে পরাজিত করে বুলবুল মেয়র নির্বাচিত হতে পারে এমন ভাবনা তারা ভাবতেই পারেননি। এমনকি প্রচারনা চালানোর সময়ও বিষয়টা কাজ করেছে। লিটনের আশপাশে থাকা নেতারা তাকে সবসময়ই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী করে তোলেন। এসব বিষয় গত নির্বাচনে খারাপ প্রভাব ফেলেছে।

সেই সাথে লিটন জাতীয় রাজনীতি ও বিএনপি জামায়াতের অপপ্রচারের শিকার হয়েছেন বলে মনে করেন দলীয় সমর্থক কর্মীরা। এসব বিষয়কে মাথায় রেখে এবারের নির্বাচনী মাঠে কাজ করেন লিটন ও তার কর্মী সমর্থকরা। লিটনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার রোধেও সচেতন ছিলেন দলীয় নেতা কর্মীরা। মাঠে নৌকার পক্ষে গণজোয়ার দেখার পরেও শেষ দিন পর্যন্ত বাড়তি আত্মবিশ্বাস রাখতে চাননি তারা। বরং ভোটের দিন পর্যন্ত ভোটারকে কাছে টানার চেষ্টা করেন নৌকার কর্মী সমর্থকরা। প্রচারে বিশেষ গুরুত্ব পায় তার সময়কার উন্নয়নগুলো। মেয়র থাকাকালে নগরের উন্নয়ন কর্মকান্ডের ফিরিস্তি তুলে ধরতে অনেক আগে থেকেই কাজ শুরু করে আওয়ামীলীগের নেতা কর্মীরা। অন্যদিকে, বুলবুল ও তার সমর্থকরা এসব ক্ষেত্রে পুরো সময়জুড়েই ছিলো পিছিয়ে। প্রচারে দলীয় নেতা কর্মীদের সাড়াও ছিলো কম।

নিজের তেমন ইতিবাচক কাজ দেখাতে না পেরে বরং পুরো প্রচারনার সময়টাই বুলবুল ধানের শীষ প্রতীকের উপরেই ভর করে ছিলেন। ধানের শীষের ভক্তরা তাকে জয়ি করবে এমন আশা করে ছিলেন বুলবুল। কিন্তু তার সেই আশা কোন কাজে আসেনি। বুলবুল দলীয় কর্মী সমর্থকদের মধ্যেও বেশ সমালোচিত হন মেয়র থাকাকালে। তার ব্যাক্তিগত ব্যবহারও অনেককেই হতাশ করে। এছাড়া লিটন এবং বুলবুলের যোগ্যতা বিবেবচনা করতে গিয়ে মানুষ লিটনের পক্ষে ঝুঁকেছেন। উন্নয়নের জন্য টাকা আনার ক্ষেত্রে যেমন লিটনের প্রতি আস্থা তৈরী হয় অন্যদিকে, রাজশাহীর মানুষের পক্ষে শক্ত নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষেত্রেও মানুষ আস্থা রাখেন লিটনের প্রতি। বিএনপির দলীয় কোন্দলও বুলবুলকে হোঁচট খাওয়ায়। তিনি যুবদলের আহবায়ক থেকে হয়েছেন মহানগর বিএনপির সভাপতি। বুলবুলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিলো নিজ দলের ভেতরকার কোন্দল মেটানো। সাম্প্রতিক সময়ে কমিটি গঠন নিয়ে স্থানীয় বিএনপিতে বড় ধরনের বিভক্তি তৈরী হয়। এসব ম্যানেজ করতে ব্যস্ত ছিলেন বুলবুল।

দলীয় নেতা কর্মীদের মান ভাঙ্গাতে বেশ চেষ্টাও করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি দলীয় কর্মীদের পুরোপুরি কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন। তাকে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে বিএনপির পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হলেও বাস্তবে তা ঘটেনি। অন্যদিকে খায়রুজ্জামান লিটনের পক্ষে মাঠে নেমেছিলো মহাজোটের অন্য সংগঠন গুলোও। লিটনকে সমর্থন জানিয়ে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন জাতীয় পার্টির প্রার্থী। লিটনের পক্ষে পুরোপুরি সময় মাঠে ছিলেন ওয়ার্কার্সপার্টি নেতা কর্মীরা। অন্য ছোট দলগুলোও তাকে সমর্থন দেয়। রাজশাহী জেলা ও মহানগর আওয়ামীলীগ নেতারা প্রচার চালিয়েছেন খুবই আন্তরিকভাবে।

জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ ও মহানগর সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার পুরো নির্বাচনী সময় জুড়ে নিরলস ভাবে নৌকার পক্ষে খেটেছেন। কর্মী সমর্থকদের ঐক্যবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল প্রচারণার ক্ষেত্রে এই দুই নেতার প্রচেষ্টা ছিলো চোখে পড়ার মত। এর বাইরে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কর্মচারিরাও প্রকাশ্য মাঠে নামেন নৌকার পক্ষে। এসব মিলিয়ে ভোটের কয়েকদিন আগেই নৌকার পক্ষে গণজোয়ার তৈরী হয়। এছাড়া তফসিল ঘোষণার পর দিনই খায়রুজ্জামান লিটন ‘চলো আবারো বদলে দেই রাজশাহী ’ এই শ্লোগানে ব্যানার ফেস্টুন, পোস্টারে ছেয়ে দেন পুরো নগরী। প্রচারে এই এগিয়ে থাকার ধাক্কা শেষ পর্যন্ত সামলাতে পারেনি বিএনপি দলীয় প্রার্থী।

Leave a Response