Monday, October 26, 2020
রাজশাহীস্বাস্থ্য

ভেঙ্গে পড়েছে রামেক হাসপাতালের যোগাযোগ ব্যবস্থা

279views

ভেঙ্গে পড়েছে রামেক হাসপাতালের যোগাযোগ ব্যবস্থা, এক বছর ধরে টেলিফোন এক্সচেঞ্জ বন্ধ

হাবিব আহমেদ: শুরুতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ১৭০ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করে। রোগি বৃদ্ধি ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় এই হাসপাতাল ধীরে ধীরে শয্যা সংখ্যা বাড়তে বাড়তে প্রায় ১২শ’ শয্যায় রুপ নিয়েছে। শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক ভবন। আধুনিক ভবনের তিনতলা পর্যন্ত ওয়ার্ড করা হয়েছে। এখনো বাকি আছে দোতলা। যদিও রোগি ভর্তির চাপ কমাতে সরকারী বরাদ্দ ছাড়াই রামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজেদের উদ্যোগেই নতুন ভবনের ওয়ার্ড সংখ্যা বৃদ্ধি করেছেন। রামেক হাসপাতালে এসেছে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য উন্নত যান্ত্রপাতিও। সব কিছুর উন্নতি হলেও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নিতি হয়নি। যোগাযোগ ব্যবস্থার এক মাত্র উপায় টেলিফোন এক্সেচেঞ্জটি দীর্ঘ এক বছর ধরে অকেজো হয়ে পড়ে আছে। এক বছর অতিবাহিত হলেও মেরামতের জন্য নেয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ। এমনকি রামেক হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে একমাত্রা যোগাযোগের মাধ্যম এই টেলিফোন এক্সচেঞ্জ আদৌ মেরামত করা হবে কি না তা নিশ্চিত নয়। কারণ কর্তৃপক্ষ টেলিফোনের বিষয়টি নিয়ে একেবারে উদাসিন।

জানা গেছে, এক সময় ওয়ার্ডে কোনো সমস্যা হলে একজন ব্যক্তিকে সময় ব্যয় করে কাঙ্খিত দপ্তরে খবর দিতে হতো। এক ওয়ার্ডের খবর অন্য ওয়ার্ডে দিতেও হিমশিম খেতে হতো কর্মরত চিকিৎসক, নার্স কর্মচারিদের। একেই তো লোকবল সংকট তার উপর বাড়তি ঝামেলা। বিষয়টি দিকে লক্ষ্য রেখে ১৯৯৯ সালে বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয় করে রামেক হাসপাতালে টেলিফোনের ব্যবস্থা করা হয়। এই টেলিফোন লাইন রামেক হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে সংযোগ দেয়া হয়। এতে যেকোনো সমস্যা বা চিকিৎসকদের তথ্য আদানপ্রদানে ব্যাপক সুবিধা হতো। জরুরী বিভাগ থেকে শুরু করে অপারেশন থিয়েটার পর্যন্ত যোগাযোগের ব্যবস্থা ছিল এই টেলিফোন। এক ওয়ার্ডে বসে থেকে পাওয়া যেতে সব ওয়ার্ডের খবর। কিন্তু এখন হাসপাতাল আধুনিক হলেও টেলিফোন এক্সচেঞ্জটি নষ্ট হয়ে পড়ে থাকার কারণে রামেক হাসপাতালের যোগাযোগ ব্যবস্থা একেবারে নাজুক হয়ে পড়েছে। সরকারীভাবে একটি মোবাইল রাখা হয়েছে। যেটি ব্যবহার করেন পরিচালক। এছাড়া রামেক হাসপাতালে আর একটি যোগাযোগ মাধ্যম রয়েছে পুলিশ বক্সের সাথে। সেখানে রয়েছে একটি সরকারী নাম্বার। ১৯৯৯ সালে টেলিফোন এক্সচেঞ্জটি স্থাপন করার পর ৬বছর ঠিকঠাকভাবে চললেও ২০০৫সালের পর থেকে রামেক হাসপাতালের যোগাযোগ ব্যবস্থার ছন্দপতন শুরু হয়। সেই ছন্দ পতন ২০১৮সালে এসে ঠেকেছে। টেফিফোন এক্সচেঞ্জটি নষ্ট হয়ে পড়ে থাকার জন্য খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে রামেক হাসপাতালের যোগাযোগ ব্যবস্থা।

জানা গেছে, ১৯৯৯ সালে ৪বছর ওয়ারেন্টি দিয়ে বসানো হয় টেলিফোন এক্সচেঞ্জটি। এরপর চারটি বছর ভালই কেটেছে। টেলিফোন এক্সচেঞ্জটি পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন চারজন অপারেটর। টেলিফোন এক্সচেঞ্জটি স্থাপন করার পর ৬ বছর কেটেছে স্বাচ্ছন্দে। এরপর শুরু হয় মেয়াদ উর্ত্তীণ্যের নমুনা। এক মাস ভাল থাকে তো দুই মাস নষ্ট। সর্বশেষ গত দুবছর আগে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ টেলিফোন এক্সচেঞ্জটি মেরামত করেন। এরপর এক বছর ভালই চলে। কিন্তু এক বছর ভাল চলার পর ২০১৭ সালের জুন মাসের দিকে আবার বিকোল হয়ে যায় টেলিফোন এক্সচেঞ্জটি। এরপর আর টেলিফোন এক্সচেঞ্জটি মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। গত এক বছর থেকে বন্ধ হয়েছে রামেক হাসপাতালে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে সকল ধরনের যোগাযোগের মাধ্যম টেলিফোন এক্সচেঞ্জটি। টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ব্যাপক সুবিধা দিলেও ১বছর থেকে অচল করে রাখা হয়েছে। আদৌ এই টেলিফোন এক্সচেঞ্জ সচল হবে কি না তা নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মেরামতের পর দীর্ঘ মেয়াদী সার্ভিস না দেয়ায় এবার টেলিফোন এক্সচেঞ্জটির মেরামত বন্ধ রাখা হয়েছে। পুরোনো এই টেলিফোন এক্সচেঞ্জটি বাদ দিয়ে নতুন ডিজিটাল টেলিফোন এক্সচেঞ্জ বসানোর পরিকল্পনা ছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। গত ১০বছর বছর ধরে এই পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। আদৌ হবে কি না তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই বলে মনে করছেন হাসপাতালের অনেকেই। এরই মধ্যে একটি টেলিকমিনিকেশনের সাথে কথা হয়েছে রামেক হাসপাতালের কর্তৃপক্ষের সাথে। ওই কোম্পানী ৭০লাখ টাকা চাওয়ায় থমকে গেছে এর কার্যক্রম। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বর্তমান মনে করছেন রামেক হাসপাতালে টেলিফোনের কোনো প্রয়োজন নেই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ইন্টার্নি চিকিৎসক জানান, ২০১০সালের পর রামেক হাসপাতালে যতগুলো অপ্রিতিকর ঘটনা ঘটেছে সবগুলো যোগাযোগ মাধ্যম ভাল না থাকার কারণে। রোগির স্বজন থেকে শুরু করে অভ্যন্তরের সব অপ্রীতিকর ঘটনার মুল কারণ যোগাযোগ ব্যবস্থা। তিনি বলেন, ওয়ার্ডে একজন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারিরা নেই সেটা পায়ে হেটে ওয়ার্ড মাস্টার অফিসে গিয়ে জানিয়ে আসতে হয়। এমনকি কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তৎক্ষনাত হাসপাতাল পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের জানানো যায় না। সরকারীভাবে পরিচালকের কাছে একটি মোবাইল নাম্বার থাকে, যা বেশিরভাগ সময় রিসিভ হয় না। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় ওয়ার্ডে কর্মরত ইন্টার্নি চিকিৎসকদের। তিনি হাসপাতালের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য দাবি জানান। সায়েদা আক্তার নামে এক নার্স জানান, কোনো কিছু প্রয়োজন হলে যোগাযোগের অভাবে তা হয়ে উঠে না। ওয়ার্ডে কোনো অপ্রিতিকর ঘটনা ঘটলে রোগির স্বজনরা তাদের মারপিট করে চলে যাওয়ার পরও সেই খবর পরিচালনা পরিষদে দায়িত্বে থাকা কর্তার কাছে পৌঁছে না। এতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় তাদের।

বিষয়টি নিয়ে ওয়ার্ড মাস্টার মোসারফ হোসেনের সাথে কথা বলা হলে তিনি জানান, ওয়ার্ড মাস্টার অফিসের সাথে ওয়ার্ডের যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় সমস্যায় পড়তে হয়। ওয়ার্ডে কোনো সমস্যা হলে আগে টেলিফোনের মাধ্যমে তাদের জানানো হতো। জানানোর পর সাথে সাথে সেই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হতো। এখন যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকার কারণে সেই সমস্যাগুলো আমরা জানতে পারি না। এছাড়াও ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারিরা ঠিকভাবে কাজ করছেন কি করছেন না, ওয়ার্ডে তারা উপস্থিত আছে কি নেই, যোগাযোগের কোনো মাধ্যম না থাকার কারণে জানা যায় না। তিনি জানান, টেলিফোন না থাকার কারণে এখন নির্ভর করতে হয় মোবাইলের উপর।

এব্যাপারে টেলিফোন এক্সচেঞ্জের ইনচার্জ খুরশেদ আলম জানান, গত এক বছর থেকে টেলিফোন এক্সচেঞ্জটি নষ্ট হয়ে পড়ে থাকার জন্য ওয়ার্ড বা বাইরেও সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষ জানলেও টেলিফোন এক্সচেঞ্জটি মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। তিনি জানান, টেলিফোন এক্সচেঞ্জটি মেরামত করতে অনেক অর্থের প্রয়োজন। তাই এটি আর মেরামত করা হবে না বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, মোবাইলে সব যোগাযোগ হওয়ার কারণে টেলিফোনের প্রয়োজন আছে বলে মনে করছেন না রামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

তবে এব্যাপারে রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিলুর রহমানের সাথে কথা বলতে সরকারী মোবাইল নাম্বারে ফোন দেয়া হলে তিনি বিষয়টি নিয়ে মোবাইলে কথা বলতে রাজি হননি।

Leave a Response