Saturday, September 19, 2020
৫ মিশালিখোলামতনারীলাইফস্টাইল

ভালবাসার গল্প

296views

রায়হানা রহমান খান :
‘আমার মন বলে তুমি আসবে, হৃদয়ে বসন্ত বাহারে, প্রেমের অভিসারে, আমার মন বলে তুমি আসবে’। হটাৎ এ গানটা বন্ধ হয়ে গেল। পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখলাম নবনিতা। সে একটু হেসে এসে বললো কি তুমি সবসময় এ গানটা শোন কেন?

আমি হেসে বললাম চল নাস্তা দেই। নবনিতা বললো ক্যান তুমি এই গানটা বার বার শোন সেটা আজ বলতেই হবে। আমি বলে উঠলাম গান তো গানই। নবনিতা বললো, না গান শুধু গান নয়, সেই ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি। এখন বলো কেন এই গান শোন তুমি। আমি ছোট একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম, সে অনেক পুরনো কথা। নবনিতা চেয়ার টেনে বসে পড়লো। আজ আমি শুনবো বল তুমি।
আমি শুরু করলাম। জানালার ঠিক ওপাশেই যেন দাঁড়িয়ে রয়েছে সে ঠিক চায়ের দোকানে সামনে। পরনে রঙ চটা জিন্স আর সবুজ পাঞ্জাবি। ডান হাতে নোংরা চায়ের কাপ আর বাঁ হাতে সিগারেট। ছেলেটিকে দেখে ক্যামন যেন অ™ু¢ত মনে হলো। চার পাশে সব সময় কয়জন বন্ধু- বান্ধবী থাকবেই। ভার্সিটিতে সবাই ভাই বলে ডাকে। আমাকেও সেই চায়ের জন্য ইনভাইট করলো আমার অন্য বান্ধবীদের সাথে। আমি চা খেতে খেতে তার কথা শুনছিলাম। একটু পরপর হা হা হা করে হেসে উঠছিলো সে। চমৎকার পরিস্কার ভাষায় কথা বলে। কন্ঠ ভারি পুরষালি। আর সব চেয়ে যেটা ভালো লাগলো আমার সেটা হলো সে এক কথায় কখনও শুনতে পায় না। কথা শেষ হতেই বলে উ উ। এই উ উ বলার সাথে সাথে তার ভ্রু একটু উঁচু করে ফেলে। চুলগুলো কালো কোকড়ানো। দেখলেই মনে হয় হাত দিয়ে ঠিক করে দেই। তবে কোন কথা বললে সে খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতো। আর কোন সাহায্য চাইলে বলতো দেখছি। ওর দেখছিটা শুনলে একটা আশা পাওয়া যেত।
এভাবে কয়দিন চললো। তারপর হটাৎই একদিন সে আমাকে চ্যলেঞ্জ করলো আমি তার সাথে রিকশায় উঠতে পারবো কিনা না। আমিও চ্যলেঞ্জ গ্রহণ করলাম। উনি রিকশায় উঠে হাতটা বাড়িয়ে দিলো। আমিও ক্যানো যেন সে হাত আর ছাড়তে পারলাম না।
গল্প আড্ডা চা খাওয়া নিজেদের অপূর্ণতার কথা সব শেয়ার করতে লাগলাম। ওকে না দেখলে আমার ভালো লাগতো না। আমাদের দ’ুজনেরই পিছু টান ছিলো। আমাদের জীবনে অপূর্ণতা ছিলো। কিন্তু আমরা কথা দিলাম আমরা নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনে কখনও ডিসলয়াল হবে না। তবে আমাদের জগৎটা যতটা সুন্দর ছিলো বাহিরটা ততটাই সমস্যাগ্রস্থ। কিছু মানুষ আমার প্রেমে পড়ে গেলো। আর কিছু তার প্রেমে। সেটা নিয়ে অবশ্য আমরা ভিশন মজা করতাম। এভাবেই চলে গেল সময়। আমাদের শেষ দেখার দিন সে আমায় বললো। আমি যাবো তোর সাথে দেখা করতে তোর দেশে। আমি হেসে বললাম আমিও অপেক্ষা করবো। আমি ফিরে এলাম সংসার হলো। কিন্তু আমাদের হাসি ঠাট্টা মেনে নিতে পারলো না। সে বিয়ে করে সুখে আছে ভালো আছে জানলাম কিন্তু আমার সুখ হলো না। একটা মেয়ের বন্ধু থাকলে তার স্বামী কখনও মেনে নিতে পারে না, সমাজ তা মেনে নেয় না। আমার স্বামী আমাকে ভালোবাসতে পারলো না। কিন্তু আমি সব মেনে নিয়েছিলাম কারণ আমার মনে হতো একজন এ পৃথিবীতে আছে যার সাথে অন্তত এক দিন আমি আমার জীবনের সব আনন্দ ভাগ করে নিবো। আমি তো কোন অন্যায় করি নি। তবে কেন ভয় পাবো। এভাবেই চলতে লাগলো দিন। আমি ছিলাম না তার পরও তার সঙ্গীর অভাব হয়নি। আমার অভাব তার জীবনে হয়তো ছিলো না। কিন্তু সে ছাড়া আর কেউ আমার বন্ধু হতে পারলো না। তবে বিশ^াস ছিলো সে আসবে একদিন আমার সাথে দেখা করতে। আমি জানি আমার মন বলে সে আসবে।
জানালা থেকে মুখ ফিরিয়ে নবনিতার দিকে তাকিয়ে দেখি সে কাঁদছে। সে আমায় বললো ১৪টি বছর ধরে অপেক্ষা করছো? ওস হ্যাঁ তাই তো ১৪ টি বছর। হ্যাঁ তাই তো এখন নবনিতার বয়স ২০। নবনিতা চোখ মুছে বললো মা আমি নিয়ে আসবো তাকে। যার জন্য তুমি নিরবে ১৪টি বছর ধরে অপেক্ষা করছো। নবনিতা বেরিয়ে গেলো বাসা থেকে। আমি আমার মত কাজ করতে লাগলাম। নবনিতা খুব একটা কথা বললো না। প্রায় এক মাস পর নবনিতা আমায় জানালো সে ছুটিতে কানাডা যাবে। আমি কখনও ওকে বারন করিনি। এখনও করলাম না। বললাম ওকে যা। তবে ৭ দিনের বেশি না। নবনিতা হেসে বললো মা দুই দিন। আমি বললাম যা। আমার দিন গুলো আগের মতই চললো। তিন দিন পর নবনিতা ফিরে এলা। তার চোখে মুখে আলোর ঝলকানি। মা কাল তুমি বাইরে যাবে রেডি হয়ে থেকো। আমি ভাবলাম এই পাগল মেয়েটা সবসময় আমাকে বাইরে খেতে নিয়ে যায়। কালও যাবে কিন্তু বলবে না। আমি রেডি হয়ে থাকলাম নবনিতা গাড়ি স্টার্ট দিলো। আমরা ব্রুকলিন এর দিকে যাচ্ছি। আমি নবনিতাকে বললাম কিরে কোই যাস? নবনিতা বললো মা চলো না। সে আমাকে ব্রুকলিন ব্রিজে নিয়ে গেল। একটা ব্রেঞ্চে বসিয়ে বললো দাড়াও কফি নিয়ে আসি। আমি একটু বিরক্ত হলাম। তবে এ অভ্যাসটা কিন্তু আমারই। আমি বসে থাকলাম। হটাৎই দেখতে পেলাম একজন মানুষ হেটে আসছে। আমি ভাবলাম কে না কে। অন্য দিকে তাকালাম। পরে দেখি সে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে আছে কে? কে এটা? আমি কি তাকে চিনি? তার ঠোট থেকে নাক তার পর চোখ দেখে চমকে উঠলাম। তার চোখে জল। একি আমিও কাঁদছি। ক্যানো? সে বরাবর এর মত দাঁড়িয়ে থাকলো। আমি তার দ্ইু গালে হাত দিয়ে বললাম আমার পাঞ্জাবি ওয়ালা। সে আমাকে জীবনে প্রথম বারের মত জড়িয়ে ধরে বললো ভালোবাসি তোকে। আমি হেসে বললাম এখন বুঝলি আমি তো সেই প্রথম দিন থেকেই জানি।
(এই ভালোবাসার গল্পে মুল নায়িকা হলো আমার মেয়ে নবনিতা। আমার গল্প শুনে সে আমার বন্ধুকে খুঁজে বের করেছিলো। তার সাথে দেখা করে যা বলেছিলো: আমার বন্ধুর নাম সানজিদ। সানজিদের বাসায় নবনিতা গিয়ে ছিলো। নবনিতা: আপনি কি সানজিদ?
সানজিদ: হ্যাঁ তুমি কে?
নবনিতা: আমি তোমার মা।
সানজিদ: চমকে উঠে ওহ ক্যামন আছো?
নবনিতা: আপনার মনে আছে আমার মাকে?
সানজিদ: সে ভালো আছে আমি জানি।
নবনিতা: কি করে জানলেন? ওহ আপনি তো পুরুষ মানুষ ইগোতে ভরা।
সানজিদ: তুমি চলে যাও।
নবনিতা: যাব কিন্তু আপনাকে আজ আমার মায়ের গল্প বলবো তার পর যাবো।
সানজিদ: ক্যান সে তো ভালো আছে।
নবনিতা: মানুষ একা কখনও ভালো থাকে না। আপনার বন্ধুত্বের দাম আমার মা ভালোভাবেই দিয়েছে। আমার বাবা তাকে ভুল বুঝে অনেক আগেই ছেড়ে চলে গেছে। সে আমাকে আর আমার ভাইকে একা মানুষ করেছে। কিন্তু কোন দিন আপনার জীবনে আসে নি। শুধু একটি গান তার সঙ্গী হয়ে ছিলো।
সানজিদ: কোন গান?
নবনিতা: আমার মন বলে তুমি আসবে।
সানজিদ: একবার কথা বলতে চেয়েছিলো। আমি বলিনি।
নবনিতা: আপনি কি একবার যাবেন আমার সাথে? ব্রোকলিন ব্রিজ, কেউ এখনো অপেক্ষা করছে আপনার জন্য। প্লিজ একবার?
সানজিদ: যাবো।)

Leave a Response