Tuesday, October 20, 2020
টপ নিউজরাজশাহী

নগরীর অলিগলিতে অনুমোদনহীন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার

311views

নগরীর অলিগলিতে অনুমোদনহীন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার

হাবিব আহমেদ: রাজশাহী মহনগরীতে যত্রতত্র গড়ে উঠছে বে-সরকারী ডায়াগনষ্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী এসব ডায়াগনষ্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক স্থাপন করে রোগিদের সাথে প্রতারণা করছেন। কর্তৃপক্ষের নাকের ডগার উপর দিয়ে এসব অবৈধভাবে গড়ে উঠা ডায়াগনষ্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক চললেও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। দোকানঘরের মত ছোট একটি ঘর ভাড়া নিয়ে সেখানে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে চলছে পরীক্ষা নিরীক্ষার কাজ।

এসব ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরীক্ষা নিরীক্ষা কতটা সঠিক তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। টেকনিশিন ছাড়াই করা হচ্ছে বিভিন্ন রোগের পরীক্ষা নিরীক্ষা। নেই উন্নত মানের যাত্রপাতিও। উন্নত পরীক্ষা নিরীক্ষা করার নাম করে এসব ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের মালিকরা রোগি ও অভিভাবকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অংকের টাকা। ফলশ্রুতিতে যারা এসব ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে পরীক্ষা নিরীক্ষা করাচ্ছেন তাদের সেই রিপোর্ট কোনো কাজে আসছে না। এছাড়াও কিছু কিছু ডায়াগনরষ্টিক সেন্টারের মালিকরা নিজেরাই চিকিৎসক ও টেকনিয়াশিয়ান সেজে সব কাজ করছেন। বেশির ভাগ ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে নেই কোনো অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান ও নার্স। তারপরও চলছে রোগির পরীক্ষা। মজার বিষয় কিছু ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের সামনে বড় বড় চিকিৎসকের নাম সম্বলিত বিলবোর্ড ঝুলানো রয়েছে। কিন্তু বিলবোর্ডে থাকা চিকিৎসকরা সেখানে কখনই বসেন না। অভিজ্ঞ চিকিৎসবদের নাম ভাঙ্গিয়ে এসব প্রতারক চক্র রোগিদের সাথে প্রতারণা করে যাচ্ছে। যেনো দেখার কেউ নাই। (অনুসন্ধানী রিপোর্টে ১ম পর্ব)

রাজশাহী সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী নগরীতে ১২০টি ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের লাইসেন্স রয়েছে। লাইসেন্স থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে ক্লিনিক বা ডায়গনষ্টিক সেন্টার পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। তারপরও লাইসেন্সপ্রাপ্ত ডায়াগনষ্টিক সেন্টার বা ক্লিনিক মালিকরা কিছুটা নিয়মনীতি মেনেই কার্যক্রম চালায়। কিন্তু এর বাইরের ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের যেমন লাইসেন্স নেই, তেমনি কার্যক্রমও প্রশ্ন বিদ্ধ। সিভিল সার্জন অফিসে এপর্যন্ত ১২ থেকে ১৫টি লাইসেন্স পাওয়ার জন্য আবেদন জমা পড়েছে। যারা আবেদন জমা দিয়েছেন তাদের মধ্যে অধিকাংশ অনুমতি না পেতেই কার্যক্রম শুরু করেছেন। যা সিভিল সার্জন অফিস জানে না। তারা আবেদন করেই ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের সকল কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

জানা গেছে, একটি ডায়াগনষ্টিক সেন্টার করতে প্রথমত সিভিল সার্জন বরাবরে আবেদন করতে হবে। এরপর সিভিল সার্জন অফিস তা যাচাইবাছাই করে অনুমোদন দিবে। সেখানে মান সম্পন্ন একটি ভবনের দরকার। এরপর সেখানে কয়েকটি রুম, একজন চিকিৎসক (সার্বক্ষনিক) নির্ধারিত দুইজন ডিপ্লোমাধারী নার্স প্রয়োজন। উন্নত মানের পরীক্ষা নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি থাকতে হবে। যা রাজশাহীর নতুনভাবে গড়ে উঠা কোনো ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে নেই। না থাকার পরও ডায়াগনষ্টিক সেন্টার মালিকরা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে এসে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন রোগি ও অভিভাবকরা।

জানা গেছে, রাজশাহীর শ্রমজীবি হাসপাতাল, নগরীর লক্ষীপুর মোড়ে অবস্থিত ন্যাশনাল ডায়াগনষ্টিক সেন্টার এন্ড হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজের গেটের সামনের গলিতে অবস্থিত সাদ ডায়াগনষ্টিক সেন্টার চলছে লাইসেন্স বিহীন। দীর্ঘদিন যাবৎ এসব ডায়াগনষ্টিক সেন্টার ও হাসপাতালে লাইসেন্স নেই। এমনকি নবায়নের জন্য তারা আবেদন করেনি। তারপরও এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়মিতভাবে চলছে রোগি দেখা ও রোগির পরীক্ষা নিরীক্ষার কাজ। সাদ ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে নেই কোনো টেকনিশিয়ান, নেই নার্স। সাদ ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে মালিক পক্ষ নিজেরাই টেকনিশিয়ান নিজেরাই নার্স। তারাই করেন সকল পরীক্ষা নিরীক্ষা কাজ। দালাল ধরে রোগি নিয়ে এসে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে গলা কাটা ফি আদায় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে নতুনভাবে সিভিল সার্জন অফিসে আবেদন করা হয়েছে লক্ষীপুরের ফেমাস ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের। আবেদন করেই তারা রোগিদের বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে চলেছেন। সিভিল সার্জন অফিস থেকে তাদের কোনো অনুমতিপত্র দেয়নি। তারপরও থেমে নেই তাদের রোগিদের চিকিৎসা থেকে শুরু করে সকল পরীক্ষা নিরীক্ষার কাজ। তাদের রয়েছে কয়েকজন দালাল। ওই দালালরা মুলত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে রোগি ভাগিয়ে এনে সেখানে পরীক্ষার নামে প্রতারণা করছেন। এছাড়াও ফেমাস ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে সাইনবোর্ড বা তাদের তৈরি করা ক্যালেন্ডারে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। মুলত এসব চিকিসকের কেউ সেখানে চিকিৎসা করতে বসেন না।

ফেমাস হাসপাতালে সার্জারি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. রেজাউল করিম, কিডনি বিশেষজ্ঞ ডা. সিদ্দিকুর রহমান, ডা. নরুল ইসলাম, সার্জারি রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এম এ হান্নান, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মাহাবুবুর রহমান খানের (বাদশা) নাম ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু তারা কখনো ফেমাস ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে বসেন না। তারা জানেন না যে ফেমাস ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের বোর্ডে ও ব্যানারে তাদের নাম রয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভিাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মাহাবুবুর রহমান খান বাদশার সাথে কথা বলা হলে তিনি জানান, আমি কখনো ফেমাস ডায়ানগনষ্টিক সেন্টারে রোগি দেখি না। তারা যে আমার নাম ব্যবহার করেছেন তাও আমার জানা নেই। অন্যান্য চিকিৎসকরাও একই বক্তব্য দেন।

বিষয়টি নিয়ে ফেমাস ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রহিমের সাথে কথা বলা হলে তিনি দাবি করেন, সিভিল সার্জন থেকে তাদের অনুমতি দেয়া হয়েছে। তবে পরে তিনি ভোল পাল্টিয়ে বলেন আবেদন করা হয়েছে কিন্তু এখনো তা পাইনি। তিনি আরো বলেন মোটা অংকের টাকা দিয়ে রাজশাহী ক্লিনিক ডায়াগনষ্টিক সেন্টার সমিতির থেকে তারা অনুমতি নিয়েছেন। তারা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নির্দেশনা নিয়েছেন।

অপরদিকে ন্যাশনাল ডায়াগনষ্টিক সেন্টার এন্ড হাসপাতালের চেয়ারম্যান সোহরাব হোসেন দাবি করেন তার প্রতিষ্ঠানের সকল কাগজপত্র ঠিক আছে। হয় তো সিভিল সার্জন অফিস জানে না।

বিষয়টি নিয়ে রাজশাহী সিভিল সার্জন সঞ্জিত কুমারের সাথে কথা বলা হলে তিনি জানান, লাইসেন্স বিহীন ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। তালিকা প্রস্তুতের পর তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Leave a Response