Saturday, September 19, 2020
আন্তর্জাতিকটপ নিউজনারীবিশেষ সংবাদরাজশাহী

দুঃসহ কষ্টে কাটে হাসির দিনরাত

382views

ইউএস বাংলা বিমান দুর্ঘটনার ২ বছর আজ

সাখাওয়াত হোসেন
স্বামী সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার। নিজে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যয়ের শিক্ষিকা। দু’জনেরই একসাথে সময় হয় না তেমন। তবে, দু’জনের ছুটি মিলে গেলেও বেড়াতে যাওয়া ছিলো তাদের প্রধান লক্ষ্য। এভাবে ছোটছোট ছুটিগুলোকে যথাযথ কাজে লাগিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরেছেন রুয়েটের সহকারী অধ্যাপক ইমরানা কবির হাসি। কিন্তু অনেক দিন একটা আফসোস ছিলো হাসির। দেশের বাইরে বেড়াতে যেতে না পারার আফসোস। সেই ইচ্ছা পূরণ করতেই ২০১৮ সালের ১২ মার্চ স্বামী রকিবুল হাসানের সাথে যাচ্ছিলেন নেপালে। নেপালে পৌঁছেছিলেন তারা। কিন্তু বেড়ানো আর হয়নি। ইউএস বাংলার বিমান দুর্ঘটনায় স্বামীকে হারিয়েছেন হাসি। তিনি ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও চরম কষ্টের দিন পার করছেন এখনো।
হাসির দুঃসহ জীবনের দুই বছর আজ। গেলো দুই বছর ধরে অবর্ননীয় কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। ২০১৮ সালের ১২ মার্চ নেপালের বিমান দুর্ঘটনার শিকার হাসি। বেড়াতে গিয়ে বিমান দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন স্বামীকে। ভাগ্যক্রমে ইউএস বাংলার সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার মাঝে পড়েও বেঁচে ফিরেছেন হাসি। হাঁটছেন, চলাফেরা করছেন, চলছেন সবার সাথেই। পার হয়ে যাচ্ছে দিন-রাত কিন্তু এক মুহুর্তের জন্যও ভুলতে পারছেন না সেই ভয়ঙ্কর মুহুর্তের কথা। স্বামীকে নিয়ে প্রথমবার দেশের বাইরে গিয়ে তাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলার কষ্টে বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠে। দু’বছর আগে চটপটে হাসির শরীরও এখন বারবার মনে করিয়ে দেয় সে আর আগের মত নেই। বাম হাতের আঙ্গুলগুলো কেটে ফেলতে হয়েছে চিকিৎসার সময়। ভাঙ্গা ডান হাত এখন ভরসা। শরীর জুড়ে পোড়ার চিহ্ন। সব মিলিয়েই যেন কষ্টই হাসির সারাক্ষণের সঙ্গি। তবু, এই বেঁচে থাকাকেই অনেক কিছু মনে করেন তিনি। এজীবনকে তিনি দ্বিতীয় জীবন পাওয়া মনে করেন। তাইতো বাকি সময়টাকে তিনি ঠিক হিসেব কষে পার করতে চান। ভালো কাজ করে, মানুষের ভালোর জন্য কাজ করতে চান।
ইমরানা কবির হাসি টাঙ্গাইল পৌর এলাকার এনায়েতপুর দক্ষিণপাড়ার সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তা হুমায়ূন কবিরের মেয়ে। তিনি রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। ইমরানা কবির হাসির স্বামী সিরাজগঞ্জ জেলার চৌহালী উপজেলার বাগুটিয়া গ্রামের মৃত রবিউল হাসানের ছেলে। এখন মা মতি ভানু বাবা হুমায়ুন কবির আর বোন তামান্না কবির তৃষার সাথে রাজশাহী শহরেই থাকেন। রুয়েট আর বাড়ি, এই দুইয়েই সময় কাটে। এত কষ্টের মাঝেও হাসির স্বস্তি আশপাশের মানুষের ভালোবাসা পাওয়া। এক হাতেই তার সব কাজ করতে হয়। সেই হাতেও কেজির বেশি ওজন উঠানো নিষেধ। তাহলে বাঁচবেন কিভাবে? হাসি বললেন, রুয়েট পরিবারের প্রতিটি সদস্যই তার পাশে দাঁড়িয়েছেন। সেই সাথে আশপাশের প্রতিটি মানুষই ভালোবাসার হাত বাড়িয়েছেন। এর ফলেই তার এই কষ্টের জীবনটাও এখন অনেকটা স্বস্তির হয়েছে বটে।
কেমন কাটছে সময়, আপনজনরা কিভাবে তার পাশে আছেন এসব জানতে এ প্রতিবেদকের দেখা হয় ইমরানা কবির হাসির সাথে। সেখানেই তিনি তুলে ধরেন তার ভাবনা, অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ। হাসি বললেন, গেলো দুই বছরের এই জার্নিটা খুব সহজ ছিলো না। খুবই চ্যালেঞ্জিং ছিলো, এখনও প্রতিটি দিন আমার জন্য চ্যালেঞ্জিং। আমি ছুটি শেষ করে গেলো সেপ্টেম্বরে রুয়েটে যোগদান করেছি। সাময়িকভাবে যোগদান। দুর্ঘটনার পরে থেকে আমি ১০ দিন কোমায় ছিলাম। সেই সময় সম্পর্কে আমি বলতে পারবো না। নেপালে ৬ দিন থাকার পর যখন সিংগাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আমার জ্ঞান ফেরে। আমি শুরুতে জানতাম না আমার স্বামীর কথা। আমার বাবা কিংবা ডাক্তাররা বলেনি। পরে যখন জানলাম, এটি আসলে মেনে নেওয়াটা খুব কঠিন ছিলো। মেনে নিতে পরিনি এবং এখনও আমার এটি বিশ^াস করতে কষ্ট হয় যে, এত কিছু ঘটে গেছে। তারপরও চিকিৎসার সমস্ত ব্যয় ইউএস বাংলা ও ইন্সু্যুরেন্স কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। সামনেও আমার অপারেশন আছে। ডাক্তাররা বলেছে, একটু সুস্থ হবার পর আবার অপারেশন করা লাগবে। এখন পর্যন্ত খরচগুলো তারাই ব্যয় করছেন। বিদেশে নিয়ে গিয়ে আমার পরিবারে পক্ষে চিকিৎসা করার মত সমর্থ নেই। এটি তারাই করেছেন। সেই সময় মোট ১১ মাস হাসপাতালে ছিলাম। এরপর আমি বাসায় যাই। বাসায় যাবার পর যেটি হয় তখনও আমি ট্রিটমেন্ট এর উপরেই ছিলাম। ফলোআপ চলতেই ছিলো। ফিজিওথোরাপি চলছিলো। এটি একটি মানসিক ট্রমা। খুব কষ্ট ছিলো আর কী। স্বামীর বিষয়টি থেকে এখনও আমি বের হয়ে আসতে পারিনি। কোনদিন পারবোও না। পুরো এক বছরের বেশি সময় আমি ফিজিওর সাখে সাইকোলজিক্যাল থেরাপি নিয়েছি। তারপরও এটি আর ভুলে যাবার কিছু না। আমার বাম হাতের পাঁচটি অঙ্গুল নেই। দুই হাতের কাজ এখন এক হাতে করতে হয়। তারপরও আমি চেষ্টা করছি স্বাভাবিক জীবন যাপন করার। যদিও সেটি স্বাভাবিক কখনও হবে না। একটি প্রতিবন্ধি মানুষকে আপনি যখনই জিজ্ঞেস করবেন, সে কেমন জীবন যাপন করছে সে যতই বলুক, হয়তো বলবে চেষ্টা করছি কিন্তু কখনও সেটি স্বাভাবিক জীবন যাপনে আসবে না। এখন আমার প্রতিটি দিন স্বামী ছাড়া মানসিক যে অবস্থা সেটিতো আপনারা বুঝতেই পারছেন। ৩০ থেকে ৩২ শতাংশ পোড়া নিয়ে একটি রোগী আমি শুধুমাত্র বলবো আল্লাহর রহমত।
আমারা যে কয়জন সবচেয়ে বেশি আহত ছিলাম তার মধ্যে আমার অবস্থা বেশি খারাপ ছিলো। আগুন নিভানো পর্যন্ত পুরোটা আমি বিমানেই ছিলাম। আগুন নেভানোর পর আমাদের উদ্ধার করা হয়েছে। সেটি কতটা খারাপ হতে পারে। বাম হাতে কোন মাংস ছিলো না। এলবোটিতে হাড় পর্যন্ত পুড়ে গেছিলো। মাথা পিঠ দুই হাত পুরাটায় পুড়ে গেছে। আমার ডান হাতে একটি ভাঙ্গা ছিলো। এখন পুরাতন ভাঙ্গা হিসেবে আছে। ডান হাতে এখনও দুই কেজির বেশি ওজন তুলতে কষ্ট হয়। তারপরও চ্যালেঞ্জ নিতে হয়। আমার মেন্টাল কন্ডিশন ভাল করার জন্যই রুয়েটে আসি। বাসায় থাকলে আমার স্বামীর স্মৃতিসহ সব কিছুই মনে আসে। এগুলো ভুলে রাখার জন্যই আমি আমার বিভাগে আসি। যাতে কিছুটা সময় অন্তত নিজেক কর্ম ব্যস্ত রাখতে পারলে আমার মানসিক অবস্থাটি একটু ভালো থাকে। এর সাথে শারিরিক সমস্যার জন্য এখনও চিকিৎসা চলছে।
এখন প্রতিদিন কিভাবে যাচ্ছে?
প্রতিদিন সকাল থেকে আমাকে এক হাতে কাজ করতে হচ্ছে। আমাকে খাওয়া, আমার টয়লেট ব্যবহার, বিভাগে আসা, নিজের পোষাক পরা, অফিসিয়াল কাজ, স্টুডেন্টদের জন্য কিছু সময় দেওয়া সবই আমাকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে হচ্ছে। এই জিনিসগুলো আমি আগে এভাবে করিনি। আমি যেটাই করতে যায় না কেন সেটি আমাকে এক হাতে করতে হচ্ছে। এখানে সময়টা কাটে আমি যে সময়গুলো দিই। এর পাশাপাশি আমার সহকর্মিরা খুবই সাহায্য করে। আমি যে জিনিসগুলো পারছি না। সেগুলো আমার কলিগ আমার বিভাগীয় প্রধান খুব সাহায্য করে। এর পাশাপাশি আমাদের ভিসি স্যার ও রেজিষ্টার স্যার সবাই বলেছেন, তুমি সুস্থ হয়ে এখানে চলে আসো। তোমার কাজে যতটা সাহায্য দরকার ততটাই করবো। এখন আমাকে বলা হয় যতটুকু কাজ পারবা ততটুকুই করো। বাঁকিটা তোমাকে আমারা সাহায্য করবো। এটির কারণেই আমার এখানে কাজ করা সম্ভব। এছাড়া অন্য কোথাও বা অন্য কোন চাকুরি হলে হয়তো আমি এভাবে করতে পারতাম না। এখানে সাবই অনেক সাহায্য করে। এখানে যে কাজটি আমি পারি না সেটি করতে তারা সাহায্য করছে। একটি ল্যাপটপও আমার পক্ষে নিয়ে যাওয়ার সমর্থ্য নেই।
কিছু অপ্রাপ্তি আছে কি না?
এখন সবার ক্ষেত্রে কী হবে আমি জানি না। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে এটি আমি বলবো আল্লাহর রহমত। আমার যেখানে যতটুকু দরকার সেখানে সেই ব্যবস্থাটি কারো না কারো মাধ্যমে হয়ে গেছে। এজন্য আমার চাহিদা বা অপ্রাপ্তি আছে এটি বলবো না। কারণ এখন যে আবস্থায় দেখছেন আমার আগের কন্ডিসনগুলো দেখেন নিজেও খুব অবাক হয়ে যাবেন যে, এই পর্যায়ে আশা মানে বেঁচে থাকাটাই বেশি কিছু। এরপরও যদি বলি আমার আশা বা আকাংক্ষা আছে তাহলে অন্যদের মত কথা বলবো না। অকৃতজ্ঞতা হয়ে যাবে।
বিমান দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে হাসি বললেন, আমি আর আমার স্বামী ৭ দিনের ছুটিতে যাচ্ছিলাম। আমরা আকাশে উড়ার পর থেকে বিমানের কোন সমস্যা বুঝতে পারিনি। কিছুই ছিলো না, কোন ঝাঁকিও না। পুরো সময়টি সুন্দর ভাবেই শেষ হয়েছে। কিন্তু আমরা খেয়াল করে দেখলাম রানওয়ে দেখা যাচ্ছে। তখন বুঝলাম এটি ল্যান্ডিং করবে। তবে কোন সমস্যাও নেই আবার কোন ঘোষনাও নাই। আমরা বুঝতে পারছিলাম না কী হচ্ছে। আমরা জানালা দিয়ে বাহিরে দেখছিলাম। আমার স্বামীও ছবি তুলছিলেন বাহিরের। আমার ডান পাশে জানালা ছিলো। আমার স্বামীও দেখছিলো। হটাৎ করে দেখলাম প্লেনটি নিচে চলে আসে, গাছ পালার কাছাকাছি। এয়ারপোর্ট এর মত কিছু খেয়াল করিনি। হয়তো এটি পাহাড় দিয়ে ঘেরা। প্রথমবার গেছি। বুঝতে পারিনি নেপালে এইটা। একদম নিচে চলে আসায় আমি মনে করেছি হয়তো এখন ল্যান্ডিং করবে। কিন্তু তখনও কোন ঘোষণা নেই। এর মধ্যেই মাটিতে অনেক জোরে ল্যান্ডিং হয়ে গেছে। পড়ার সাথে সাথে প্লেনটি ভেঙ্গে গেছে, সিটগুলো এলোমেলো হয়ে গেছে। এতটা অকশ্মিক ভাবে পড়েছি যে, বুঝতে পারিনি কী হলো। তখনও বুঝতে পারিনি। আমি তাকিয়ে দেখলাম আমার স্বামী সিটটি উল্টে আছে। সিটের নিচে চাপা পড়ে আছে। আমি ওকে শেষ পর্যন্ত দেখতে পায় নি। প্রত্যেকেরই একই অবস্থা। নামার সাথে সাথে আমার ডান হাতটি ভেঙ্গে গেছে। আমি বুঝলাম আমার হাত কিছু হলো। তখন বুঝলাম এটি একটি এক্সিসিডেন্ট হয়েছে সেটি বুঝতে পারলাম। এই সময়টি খুবই অল্প সময়ে এক মিনিটেরও কম। বুঝার পর মনে হলো এটিতে আর কেউ বাঁচবে না। এরপরেই দেখলাম পিছন থেকে আগুন। প্রথম ধাক্কাতেই আমার স্বামীর মাথায় লাগে। আগুন লাগার পর আমি বুঝছি আমি মারা যাচ্ছি। আমি সিট বেলটাও খুলতে পারছিলাম না। আগুনে আমার পিঠ পুরো মাথা দুই হাত পুড়ছে যতক্ষন পর্যন্ত আগুন না নেভানো হয়েছে। ততক্ষন পর্যন্ত আমি বুঝছি আমি মারা যাচ্ছি। তখন আমার মনে হলো নিশ^াস বন্ধ করে মারা যাই। কিন্তু সেটাও সম্ভব না। আমি এক হাত দিয়ে আমার ওড়না পেচিয়ে নাকে ধরলাম যাতে কালো ধোঁয়া থেকে বাঁচা যায়। ওড়নাটাও পুড়ে গেলো। কিছুই আর অবশিষ্ঠ ছিলো না। এক পর্যায়ে মনে হলো পানি জাতীয় কিছু দিলো। তখনও আগুন নেভেনি। এরপর ফোম টাইপের কিছু দিলো। তখন আমার গায়ের আগুন নেভে। যেটি খেয়াল করে দেখলাম আমার চোখ পুরোটাই ক্ষতিগ্রস্ত। আমি শুধু দেখলাম আর্মি ড্রেস বা কিছু আমার সামনে এক মহিলা ছিলেন। তারও জ্ঞান ছিলো না। আমি তাদের উদ্ধার করতে বললাম। আমি বললাম আমার স্বামীর কথা। তারা বললো সবাইকে নেওয়া হবে। আমার যেটি মনে হলো যারা একটু ভালা আছেন তাদের আগে নেওয়া হচ্ছে। আমার সামনের সবাইকে নেওয়া হলো তারপর আমাকে নেওয়া হলো। একই এম্বুলেন্সে আমার সামনের মহিলা ও আমাকে নেওয়া হয়। এটি এতটাই যন্ত্রনাদায়ক বলে বুঝানোর মত না। এর চেয়ে আমার মনে হয় মৃত্যু অনেক ভালো। এটুকু মনে আছে, নেপালে একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর লিফট পার করে যখন ট্রলিটা নিয়ে যাওয়া হলো আমার খুব পানি পিপাসা লাগছিলো। আমি শুধু পানি চাইলাম। এরপর আমাকে পানি দেওয়া হলো কি না আমি বলতে পারবো না। এরপর আমি জ্ঞান হারায়।
প্রথম জ্ঞান ফেরা
প্রথম যেদিন জ্ঞান ফিরে আমার পুরোটায় ব্যান্ডিস করা ছিলো। আমার তাকাতে কষ্ট হচ্ছিলো। আমার মনে হচ্ছিলো আমার লাইফ সার্পোট খুলছিলো। আমার মনে হচ্ছিলো যে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫ মিনিট আগেই। হয়তো আমার নাক থেকে অক্সিজেন খুলে নিচ্ছে। মনে করেছি আমি হয়তো মরে গেছি। আমি বলছিলাম ক্যানো ঐটা খুলে নিচ্ছে। তখন ডাক্তাররা আসলেন। আমার নাম কী? এসব জিজ্ঞাসা করা হলো। আমি বলছিলাম আমার স্বামী কোথায়। আমি শুধু তাদের বলছিলাম আমাকে ব্যাথার ট্যবলেট দেন অথবা ঘুমানোর ওষুধ দেন। আমি জানতামও না যে বাবা আমার সাথে আসছে। বাবাসহ অন্যান্য আত্মিয়রা আসলেন। বাবা আমার স্বামীর কথা বলে নি। বারবারই বলছিলাম রাকিব কোথায়? তারা বলে সে নেপালে আছে, তোমার অবস্থা খারাপ তাই তোমাকে এখানে আনা হয়েছে। অনেক দিন পরে আমি জানতে পেরেছি রাকিব নেই।
হাসি বললেন, দেশের বাহিরে এই প্রথমবারই আমার যাওয়া। এমনিতে আমার স্বামী ঢাকায় সফটওয়ার ফার্মে চাকুরি করতেন, আর আমি এখানে। এজন্য আমরা কোন ছুটি পেলেই বাহিরে ঘুরতে যাবার চেষ্টা করতাম। আমার ও আমার স্বামীর ঘুরতে যাওয়া খুব ভালো লাগতো। এটাও আমার ছুটির মধ্যে পরিকল্পনা করা হয়। বিয়ের পর থেকেই বাহিরে ঘুরতে যাবার খুব ইচ্ছে ছিলো। বিয়ের ৪ বছর পর এটি পরিকল্পনা করা হয়। আসলে এটি বুঝতেই পারিনি এমন একটা কিছু হবে। খারাপ কপাল নিয়ে জন্মিয়েছি।
এখন দিন কেমন কাটছে?
আসলে দিন কেমন এটি বলতে গেলে বলেবো প্রতিটি দিনই আমার জন্য অনেক বেশি চ্যালেঞ্জ। কারণ আমার আগে যে সময়টা ছিলো সেটা থেকে রিকভারি করে হয়তো বা শারিরিক ভাবে চলাফেরার মত বা কর্মস্থলে যোগদান করার মত হয়েছে। কিন্তু মানসিক ভাবে কতটা হয়েছে সেটা আল্লাই বলতে পারবে। তার কারণ এখনও দু:স্বপ্নগুলো বেশির ভাগ সময়ই বয়ে বেড়ায়। বেশিরভাগ সময় আমি সপ্নে দেখি প্লেন দুর্ঘটনা। আমার স্বামী ছিলো। ঐ জিনিসগুলো বেশিরভাগ সময় আমার স্বপ্নে আসে। সেটি থেকে বের হয়ে আসাটা এত সহজ হবে বলে আমার মনে হয় না। এক হাত দিয়ে কাজ করা খুবই কষ্টকর। তারপরও আপনারা দোয়া করবেন আমার ও আমার স্বামীর জন্য।
আমার বাড়িতে মা বাবা আর ছোট বোন আছেন। সবার সাথেই এখনও থাকি। যেহেতু আল্লাহ দ্বিতীয়বার সুযোগ দিয়েছে, আমারও একটি ইচ্ছে আছে। ভালো কিছু করে যাওয়ার। অন্তত আমার মত যারা শারিরিক অক্ষম আছে। আপনারা হয়তো আমাকে দেখছেন, হ্যা আমি খুব ভালো চালফেরা করছি। নরমাল জীবন যাপন করাছি। হাসিখুশি থাকছি কিন্তু একটি পোড়া, শারিরিক অক্ষম রোগীর জীবন কখনই এক হয় না। আমার ইচ্ছে আছে এই সব মানুষদের নিয়ে কাজ করার। যাদের এই রকম সমস্যা আছে। আমার এগুলো নিয়ে কাজ করার খুব ইচ্ছে আছে। দোয়া করবেন আমি অন্তত ভালো কিছু করে যাই। আল্লাহ যেহেতু আমাকে দ্বিতীয় জীবন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখছেন, এ জীবনটাই আমি ভালো কাজ করে যেতে চাই।

Leave a Response