Friday, September 18, 2020
খোলামতসারাদেশ

টেকসই উন্নয়ন অভিষ্ট্য (এসডিজি) অর্জনে বাংলাদেশ

155views

টেকসই উন্নয়ন অভিষ্ট্য (এসডিজি) অর্জনে বাংলাদেশ

মো. সিকান্দার আবু জাফর: বিশ্বব্যাপী ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অসমতা, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ বিপর্যয় মোকাবিলা করা এবং শান্তি ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সামাজিক জীবনে টেকসই ভবিষ্যত গঠনের লক্ষ্যে ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে গৃহীত হয় টেকসই উন্নয়ন অভিষ্ট্য (এসডিজি)। টেকসই ভবিষ্যত গঠনে এসডিজি’র লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বিকল্প নেই। তাই এসডিজি বিশ্বব্যাপী টেকসই ভবিষ্যত অর্জনের ব্লুপ্রিন্ট নামে পরিচিত। যে ব্লুপ্রিন্ট বিশ্বের দেশসমূহের কাছে মোট ১৭টি অভিষ্ট সমন্বিত একটি দলিল।

২০৩০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে গৃহীত অভিষ্টগুলো অর্জনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। যা ২০১৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে কার্যকর হয়। অত্যন্ত গর্বের বিষয় হলো, মোট ১৭টি অভিষ্ট্যের মধ্যে ১৫টি বাংলাদেশের সুপারিশকৃত প্রস্তাবের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। সংগত কারণেই এসডিজি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশও বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে এসডিজি’র সে গুরুত্বের প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। ক্ষেত্র অনুযায়ী, দেশের এ পর্যন্ত অর্জনগুলো পর্যালোচনা করলে তা সহজেই প্রতিয়মান হয়। দেশে ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে দারিদ্র্যের হার ছিল ২৪.৩ শতাংশ যা ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে এসে দাঁড়ায় ১৮.৬ শতাংশে। ক্ষুধা দূরীকরণ ও খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের লক্ষ্যে পরপর তিন বছরে খাদ্য উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে দেশে খাদ্য উৎপাদন ছিল ৩৬৮ লাখ মে. টন, ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে হয় ৪১৩.২৫ লাখ মে. টন এবং ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে হয় ৪১৫.৭৫ লাখ মে. টন। স্বাস্থ্য সেবার মান বৃদ্ধির ফলে কমে এসেছে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার।

ডব্লিউএইচও-এর মতে, ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে দেশে মাতৃমৃত্যুর হার ছিল ১৭৮ (প্রতি লাখ জীবিত জন্মে) যা ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে হয় ১৫৭। বিশ্বব্যাংকের মতে, ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে মৃত্য হার ছিল ৩৬ (প্রতি হাজার জীবিত জন্মে) যা ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে হয় ২৮। শিক্ষাক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টির কারণে দেশে নিয়মিত সূচকে শিক্ষার হার বাড়ছে। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে দেশে শিক্ষার হার ছিল ৭২.১ শতাংশ যা বর্তমানে ৭৫ শতাংশ। নারী সমতা ও ক্ষমতায়নে এখন বাংলাদেশ বিশ্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। নারী সমতা অর্জনে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম। বর্তমানে দেশে নারী শিক্ষার হার ৭২% যা ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে ছিল ৪৩.৭%। ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশে নারীদের প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণের হার ছিল ৫৭% যা বর্তমানে ৯৯.৪০%।

বর্তমানে সচিব, অতিরিক্তি সচিব, যুগ্ম সচিব, উপসচিবসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি চাকুরিতে প্রায় ২৭% নারী কর্মরত রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলেও বর্তমান জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী, স্পীকার, বিরোধীদলীয় নেত্রীসহ মোট ৭৩ জন নারী দায়িত্ব পালন করে আসছেন যা বিশ্বে বিরল। নারীর উন্নয়নের স্বীকৃতিস্বরুপ ইতোমধ্যে বিভিন্ন অ্যাওয়ার্ড বাংলাদেশের ঝুলিতে জমা পড়েছে। বাংলাদেশ নারীর ক্ষমতায়নের উল্লেখযোগ্য অর্জনের স্বীকৃতিস্বরুপ ড. কালাম মেমোরিয়াল ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড-২০১৯, লাইফ টাইম কন্ট্রিবিউশন অ্যাওর্য়াড-২০১৯, গ্লোবাল ওমেন’স লিডারশীপ অ্যাওয়ার্ড-২০১৮, পিস ট্রি অ্যাওয়ার্ড-২০১৪ লাভ করেছে।

নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্বত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা বিষয়ক অভিষ্ট্য অর্জনে এ দেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে দেশের ৮৭ শতাংশ মানুষ নিরাপদ পানি পান করতে পারতো, এখন প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষ এ সুবিধা ভোগ করছে। আবার ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে দেশের ৬১ শতাংশ মানুষ নিরাপদ পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধার আওতায় ছিল যা বর্তমানে ৮০ শতাংশের উপরে। বিদ্যুৎক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অর্জন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বর্তমানে দেশের ৯৫ শতাংশ জনগণ বিদ্যুতের সুবিধা ভোগ করছে। আশা করা হচ্ছে, ২০২১ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে দেশের সব মানুষ বৈদ্যুতিক সুবিধার আওতায় আসবে। অথচ ২০১৬ খ্রিস্টাব্দেও এর হার ছিল ৭৫ শতাংশ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনেও চমৎকার ধারাবাহিকতা দেখা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থ বছরের পরের সময়ে নিয়মিত হারে বেড়েছে অর্থনৈতিক প্রবুদ্ধি।

২০১৫-১৬ অর্থ বছরে ছিল ৭.১১ শতাংশ, ২০১৬-১৭ এ ৭.২৪ শতাংশ, ২০১৭-১৮ তে হল ৭.৮৬ শতাংশ এবং ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে এসে দাঁড়ায় ৮.১৩ শতাংশ। যা দেশের ধারাবাহিক উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন তরান্বিত করণের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা সুদৃঢ় করা এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করবার লক্ষ্যে এসডিজি’র ৯ নম্বর অভিষ্ট্য অর্জনে ব্যাপক উন্নয়নমূলক কর্মপরিকল্পনা বর্তমানে চলমান রয়েছে। দেশে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল(এসইজেড), বহুমুখী পদ্মা সেতু, পদ্মা রেল সংযোগ সড়ক, মেট্রোরেল প্রকল্প, রুপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মাতার বাড়ি বিদ্যুৎ কেন্দ্র, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল সংযোগ, পায়রা সমুদ্র বন্দর, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর, মহেশখালী এলএনজি টার্মিনাল ইত্যাদি মেগা প্রকল্পগুলো অন্যতম।

এর ফলে দেশে শিল্পায়নের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে এবং কিছুক্ষেত্রে প্রবল সম্ভাবনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এতে করে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সুদৃঢ় অর্থনীতির ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হবে বলে আশা করা যায়। দেশে ডিজিটাল সেবার পরিসর ছড়িয়ে দেবার ফলে শহর ও গ্রামের মধ্যকার বৈষম্য কমে এসেছে। সরকারের ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ স্লোগান এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে নিজস্ব তহবিল গঠন করে নিয়মিত বরাদ্দ প্রদান করে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। ফলে প্রাকৃতিক বিভিন্ন দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ইতোমধ্যে অনেকাংশে কমানো সম্ভব হয়েছে। কমেছে প্রাণহানির সংখ্যাও।

সামুদ্রিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং এ সম্পদকে টেকসই করতে ‘বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০’ নামক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করে বাস্তবায়ন কাজ এগিয়ে চলছে। ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও সর্বস্তরে দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে বিভিন্ন স্বাধীন কমিশন গঠন, যুগোপযুগী আইন প্রনয়ণ, দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের সাফল্যস্বরুপ বাংলাদেশ স্বল্পোন্বত দেশের তালিকা থেকে উত্তোরণের সুসংবাদ পেয়েছে এবং এ পর্যন্ত এসডিজি বাস্তবায়নে প্রথম সারির দেশসমূহের তালিকায় অবস্থা করে নিয়েছে। জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফসহ বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি উন্নয়নমূলক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্জনকে অনন্য বলে স্বীকারে করে নিয়ে এসডিজি অর্জনে বাংলাদেশ প্রায় ১০০ ভাগ সফল হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। লেখক: সহকারী তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, রাজশাহী।

Leave a Response