Saturday, October 24, 2020
টপ নিউজরাজশাহী

গোদাগাড়ীতে হালকা বৃষ্টি হলেই সড়কে মৃত্যুর মিছিল

433views

গোদাগাড়ীতে হালকা বৃষ্টি হলেই সড়কে মৃত্যুর মিছিল

গোদাগাড়ীতে সড়ক দুর্ঘটনাশামসুজ্জোহা বাবু,গোদাগাড়ী প্রতিনিধিঃ রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে সড়ক দুর্ঘটনা একটি অতি সাধারণ ব্যাপার হয়ে পড়েছে! আর হালকা বৃষ্টি হলেই রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়কে যেন মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়ে যাচ্ছে। মানে এই যেমন,আলু,ভাত,পান্তা কিংবা আমাদের নিত্য নতুন মৌলিক চাহিদার মত যেসব জিনিসপত্র আমাদের প্রয়োজন পড়ে সেরকমই বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে সড়ক দুর্ঘটনাও! প্রতিদিন টিভি,পত্রপত্রিকা,স্যোসাল মিডিয়াসহ বিভিন্ন মাধ্যমে চোখে পড়ছে সড়ক দুর্ঘটনার মত অনাকাঙ্খিত বিষয়!! পত্রপত্রিকার বাইরেও আমাদের পরিবার পরিজন,পাড়া প্রতিবেশি কিংবা আত্মীয়-স্বজনের মধ্যেও প্রায় শুনতে হয় সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে মৃত্যুর খবর নয়ত আহত হওয়ার সংবাদ।

কিছু পত্রিকায় সড়ক দূর্ঘটনার নিউজ প্রকাশিত হওয়ার পর সড়ক ও জনপদ বিভাগ এবং রাজশাহী জেলা পুলিশ দুর্ঘটনা প্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে গাড়ীর গতি কমানোর জন্য সাইনবোর্ড লাগালেও এর কোন উপকারিতা পাচ্ছে না সাধারণ জনগন। রাস্তা সংস্করণের পর থেকেই এ সড়কে দুর্ঘটনা বেশী ঘটছে। এতে জনসাধরণের মনে প্রশ্ন জাগছে রাস্তা নির্মানে কোন ঘাটতি নাই তো? কারণ বৃষ্টি হলেই গাড়ী রাস্তায় না থেকে সরাসরি খাদে পড়ে যাচ্ছে।

গোদাগাড়ীতে সড়ক দুর্ঘটনাহালকা বৃষ্টির সময় আজ শনিবার সকাল ৮ টার দিকে উপজেলার কাদিপুরে মাক্রোবাসের ধাক্কায় এক নারী শ্রমিক নিহত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার খুব ভোরে উপজেলার মহিষালবাড়ীতে ঘুমন্ত ট্রাক চালক দ্রুত গতিতে একটি বাড়ীর ভিতর ট্রাক ঢুকিয়ে দিলে বেশ কয়েকজন আহত হয় এবং বাড়ীটির দেওয়াল ভেঙ্গে যায়।এছাড়া শুক্রবার খুব ভোরে হালকা বৃষ্টিতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উপজেলার কাদিপুরে ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হরিয়ে খাদে পড়েগেলে চালকসহ কয়েকজন গুরুত্বর আহত হয়।

গোদাগাড়ী উপজেলায় প্রতিদিন এই ধরনের সড়ক দূর্ঘটনা যেন নিত্যপ্রয়োজনীয় পন্যরে মত হয়ে দাড়িয়েছে। এছাড়াও গত (২২ ও ২৩ শে জুলাই) রবিবার ও সোমবার দুদিনে রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে পৃথক নয়টি সড়ক দুর্ঘটনায় মা-মেয়েসহ ৮ জন নিহত ও ৫০ জন আহত হয়েছে।

২২শে জুলাই রোববার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে একটি মালবাহী কার্গো ট্রাকের ঘুমন্ত চালকের কারণে ঝরে গেছে এক ব্যবসায়ীর প্রাণ। এরকম ঘুমন্ত চালকের হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার কি কোন উপায় নেই?

গোদাগাড়ীতে সড়ক দুর্ঘটনারবিবার রেলগেটের নিজস্ব দোকানে বসেছিল জসিম, হঠাৎ চাপাইনবাবগঞ্জগামী একটি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাংসের দোকানে ঢুকে গেলে ঘটনাস্থলে মারা যায় জসিম। এতে আহত হয় আরও দুইজন। তাদের ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করেন। আহতরা হলেন একই গ্রামের মহিউদ্দীনের ছেলে বাবু (৩০) ও আলাউদ্দীনের ছেলে সেলিম (৩২) । নিহত জসিম উপজেলার রেলগেট কসাইপাড়া গ্রামের তসলিম উদ্দীনের ছেলে।

এছাড়া সকাল ১০টার দিকে ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে দুজন মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়। উপজেলার রাজাবাড়ী ছয়ঘাটি নামক স্থানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ গামী ট্রাক ও বিপরীত দিক থেকে আসা মোটরসাইকেলের মুখোমুখী সংঘর্ষে ঘটনা স্থলেই দুইজনের মৃত্যু হয়। নিহতরা হলেন উপজেলার ফরাদপুর গ্রামের এমাজউদ্দীনের ছেলে এমদাদ হেসেন চান্দু (৫০) গ্রামের সানারুল ইসলামের মেয়ে খুসবু তাজনীম (১৪) দশম শ্রেনীর ছাত্রী ছিল।

এছাড়া বেলা ১১ টার দিকে উপজেলার কাদিপুর নামক স্থানে দুটি ট্রাকের মুখোমুখী সংর্ঘষের সময় চলন্ত একটি অটোরিক্সা কে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলেই শিশুসহ ৪ জন আহত হয়।

এছাড়াও বেলা ১২ টার সময় উপজেলার রাজাবাড়ীতে রাজশাহী গামী যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে ২০ জন আহত হয়।

গোদাগাড়ীতে সড়ক দুর্ঘটনাএ দিকে বিকেল সাড়ে ৪ টার দিকে উপজেলার রেলগেট বাইপাস নামক স্থানে রাজশাহীগামী ট্রাকের সাথে চাঁপাইনবাবগঞ্জ গামী মাইক্রোবাসের মুখোমুখী সংঘর্ষে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের ভাসতিসহ একই পরিবারের ৩ জন মা,মেয়ে ও ছেলে এবং মাইক্রোবাস ড্রাইভার নিহত হয়। নিহতরা হলেন চাঁপাই নবাবগঞ্জ মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আলমঙ্গীর হোসেনের স্ত্রী খাতিজাতুল কুবরা (৩৫),মেয়ে রাইসা (৩), ছেলে আহসান আলমঙ্গীর (৫) এবং ড্রাইভার নাটোর সিংড়া উপজেলার পলক (২৫)। আহতদের উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এছাড়াও রবিবার রাত সাড়ে ১২ টায় গোদাগাড়ীতে চাঁপাইনবাবঞ্জ -রাজশাহী মহাসড়কের গোদাগাড়ী কলেজের পার্শ্বে এক মানুষিক প্রতিবন্ধিকে বাচাঁতে গিয়ে দুটি মালবাহী ট্রাকের মুখোমুখী সংঘর্ষে মৃত্যু হয় সেই প্রতিবন্ধির।

আবার সোমবার ভোরে উপজেলার বিজয়নগরে দুটি ট্রাকের মুখোমুখী সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হয়।পরে বেলা ৯ টার দিকে রাজাবাড়ী আলিমগঞ্জ এলাকায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ গামী ন্যাশনাল ট্রাভেলসরে এসি কোচ ও ট্রাকের মুখোমুখী সংঘর্ষে আহত হয় চার জন।

গোদাগাড়ী ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন মাষ্টার আতাউর রহমান বলছেন, ২০১৮ সালে সড়ক দুর্ঘটনা তার আগের বছরের তুলনায় অনেক গুনে বেড়েছে আর এসব দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ব বরণ করেছে হাজারও মানুষ, এমনকি মৃত্যুর হারও বেড়েই চলেছে। গত ঈদেই যে পরিমান মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে তা পূর্বের বছরের তুলনায় অনেক গুন বেশি!

তিনি আরও বলেন,গত বছর জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে সড়ক দূর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ১৩ জন এবং আহত হয়েছে দুই শতাধিক । এভাবেই প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় ঝরে পড়ছে চিরচেনা অসংখ্য প্রাণবন্ত মুখ।

এছাড়া উপজেলায় মোট সড়ক দূর্ঘটনা ঘটেছিল প্রায় ৫০ টিরও বেশী। এ বছর গত দুই মাসে প্রায় ৪০ টিরও বেশী সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ১২ জন, আহত দুই শতাধিক। আমাদের অনিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা,ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন, অদক্ষ চালক,যানবাহনের মাত্রাতিরিক্ত চলাচল,ওভারটেকিং,সিগন্যাল তোয়াক্কা না করাসহ বিভিন্ন কারণে প্রতিনিয়তই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে! যার ফলশ্রুতিতে আমরা হারাচ্ছি পরিবারের কোনো সদস্য,আত্মীয়-স্বজন পাড়া প্রতিবেশিকে!

আবার বিভিন্ন উৎসব যেমন ঈদ,পূজা বা কোনো দিবসেও সড়ক দুর্ঘটনার প্রবণতা অনেকগুন বেড়েছে! এসব থেকে পরিত্রাণের উপায় আমাদেরকেই বের করতে হবে। সড়ক বিভাগের আইনের প্রয়োগ বৃদ্ধি,ফিটনেসবিহীন যানবাহন বন্ধ,দক্ষ চালক,নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাসহ ওভারলোডেড যাত্রী উঠানামা বন্ধ করে দেশে একটা সামাজিক সচেতনা বৃদ্ধির জোর চেষ্টা চালাতে হবে।

জানিনা আর কত জীবন গেলে নিজের জীবনের নিরাপত্তা আমরা পেতে পারি? কামাল নামে একজন চালক বলেন, রাস্তায় হালকা বৃষ্টি হলেই ছোট গাড়ীর ব্রেক কম কাজ করছে। এবং রাস্তায় বেশী তাপমাত্রায় পিচ গলে চটচটে হয়ে যাচ্ছে। ফলে সঠিক ভাবে গাড়ীর নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বৃষ্টি বা অতিরিক্ত রোদ হলে ব্রেক না কাজ করার কারণ হলো গাড়ী ভেসে যাচ্ছে ফলে নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব হচ্ছে না।

রাজশাহী জেলা মটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি কামাল হোসেন রবি বলেছেন অনিয়মতান্ত্রিক ভাবে আটো,ভুটভুটি মহাসড়কে চলাচল, রাস্তায় খড়,ফসল শুকানো,অপরিকল্পিতভাবে ট্রাকে মাটি বা বালু উত্তলনের সময় সড়কে পড়ে যাওয়ায় রাস্তা ব্যবহার উপযোগী হয়ে না থাকায় সড়ক দূর্ঘটনা বেশী ঘটছে । এছাড়াও অপ্রাপ্তবয়স্ক বাস, ট্রাক, আটো বা মটর সাইকেল চালকের জন্যও দূর্ঘটনা বেশী হচ্ছে । রাস্তা নির্মানে কোন গাফেলতি আছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করে দেখতে হবে।

গোদাগাড়ী উপজেলা প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার মোস্তাক আহামদ বলেন,গত কয়েকদিনে গোদাগাড়ী মহাসড়কে দুর্ঘটনা বেশী হওয়ার কারণ হল সুন্দর রাস্তা! রাস্তা ভাল হওয়ায় সকলে গাড়ী দ্রুতগতিতে চালাছে। বেশী তাপমাত্রায় পিচ গলে যাওয়া প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন,রাস্তা তৈরীর সময় বিটুমিন বেশী হওয়ায় এমন হচ্ছে। ফলে গাড়ীর নিয়ন্ত্রণ সঠিক ভাবে না হতে পারে।তবে বিটুমিন কম হলে রাস্তার স্থায়ীত্ব কম হবে। রাস্তা পিচ্ছিল দূর করতে হলে মহাসড়কে ডাবল বিটুমিনার সার্ফেসিটি টির্টমেন্ট (ডিবিএসটি) অর্থাৎ রাস্তার উপরে হালকা উচু উচু পাথর বসালে পিচ্ছল কমবে বলে মনে করেন এই কর্মকর্তা।

এ বিষয়ে গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইউএনও শিমুল আকতার বলেন, সড়ক ও জনপদ বিভাগের সাথে আলোচনা করে দুর্ঘটনা রক্ষার্থে প্রয়োজনীয় যা করা দরকার তা করতে হবে।

এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীতি চাকমা বলেন, এ বিষয়গুলো নিয়ে আমরা উপর মহলে কথা বলেছি এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি।পূর্বের দূর্ঘটনার পরিপেক্ষিতে সতর্কীকরণ বোর্ড স্থাপন করেছি। তাতেও কোন লাভ হচ্ছেনা। কারণ ঘুমন্ত চালক,অপ্রাপ্তবয়স্ক হেলপার দিয়ে গাড়ী চালালো,অসাবধানতা,দীর্ঘ সময় ধরে ড্রাইভিং করা,ফিটনেশ বিহীন গাড়ী সড়কে চলাচলের করণে রোধ হচ্ছেনা সড়ক দূর্ঘটনা। এই সব দূর্ঘটনা থেকে বাঁচতে হলে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

ডাবল বিটুমিনার সার্ফেসিটি টির্টমেন্ট (ডিবিএসটি) করার বিষয়ে বলা হলে তিনি বলেন, এটা নতুন রাস্তায় তৈরীর নিয়ম নাই বা অনুমোদন দিবে না মন্ত্রনালয়, এটা তৈরী করা হয় ২-৩ বছরের পুরাতন রাস্তায়। তাই এটা এখনই সম্ভব নয় । তবে রাস্তা নির্মানে আমাদের কোন ঘাটতি নাই।

Leave a Response