Monday, October 26, 2020
অর্থনীতিসারাদেশ

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানামুখী উদ্যোগেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না ডলারের বাজার

384views

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানামুখী উদ্যোগেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না ডলারের বাজার

রাজশাহী সংবাদ ডেস্ক: দেশে ডলারের বাজারে অস্থিরতা চলছেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানামুখী উদ্যোগ নিয়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। এক বছরের ব্যবধানে আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ডলারের দাম বেড়েছে ৩ টাকার বেশি। বাজার স্বাভাবিক রাখতে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় ২৪০ কোটি ডলার বিক্রি করেছে। পাশাপাশি অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে ব্যাংকগুলোকে কয়েক দফা সতর্কও করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তা কাজে আসছে না। বর্তমানে প্রতি ডলার ৮৫ টাকার উপরে বিক্রি হচ্ছে। আর চাহিদা থাকায় ব্যাংকগুলো হিসাব-নিকাশ ছাড়াই আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খুলেছে। এখন এলসির দায় পরিশোধ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের তুলনায় বেশি আমদানি এলসি খোলা ব্যাংকগুলোর বিপদ ক্রমেই বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও তুলার দাম বাড়তে থাকায় শিগগিরই ডলারের সংকট নিরসনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বাজার স্থিতিশীল রাখতে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় ২৪০ কোটি ডলার বিক্রি করেছে। একই সময়ে বাজার থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো ডলার কেনার প্রয়োজন হয়নি। অথচ গত অর্থবছর বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে ১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিক্রির বিপরীতে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ১৯৩ কোটি ১০ লাখ ডলার ক্রয় করেছিল। এর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরেও বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার বিক্রির প্রয়োজন হয়নি। যদিও ওই অর্থবছর বাজার থেকে ৪১৩ কোটি ১০ লাখ ডলার কিনেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তাছাড়া ২০১৪-১৫ অর্থবছর বাজার থেকে ৩৭৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার কেনা হয়। আর অর্থবছরটিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিক্রি করেছিল ৩৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার। তার আগে ২০১৩-১৪ অর্থবছর বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ৫১৫ কোটি ডলার কিনলেও ওই বছর কোনো ডলার বিক্রি করেনি। মূলত ব্যাংকগুলোর চাহিদার ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার বিক্রি করছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তেল আমদানির দায় পরিশোধকে সেক্ষেত্রে বেশি প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নিজেদের ব্যবস্থাপনায় এলসির দায় পরিশোধ করতে ব্যাংকগুলোকেও উৎসাহিত করা হচ্ছে। সূত্র জানায়, খাদ্যশস্যসহ মেগা প্রকল্পগুলোর উপকরণের জন্য বিপুলসংখ্যক এলসি খোলা হয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আমদানিতে প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ২৫ শতাংশ। কিন্তু রফতানি ও রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি সেভাবে না হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংকগুলোয় ডলারের সংকট তৈরি হয়েছে। বিগত ২ বছর ধরেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান মাধ্যম রফতানি আয় ও রেমিট্যান্সপ্রবাহে ভাটা চলছে। পাশাপাশি রেকর্ড পরিমাণ চালসহ খাদ্যশস্য ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি হওয়ায় বেড়েছে আমদানি ব্যয় পরিশোধ। ফলে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) দেশের চলতি হিসাবে রেকর্ড ৮৫১ কোটি ডলারের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। যদিও ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ওই সময়ে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১৭৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার। তার আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের চলতি হিসাবে ৪২৬ কোটি ২০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত ছিল। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) আমদানির জন্য ৬ হাজার ৭২ কোটি ৮০ লাখ ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যা ৫১ দশমিক ৯৪ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ১৫ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ এলসি নিষ্পত্তি বেড়েছে। অথচ ওই সময়ে রফতানি বেড়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ। আর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আড়াই শতাংশ কমার পর গত অর্থবছর রেমিট্যান্স সাড়ে ১৪ শতাংশ কমেছে। চলতি অর্থবছরে (জানুয়ারি-মে) রেমিট্যান্স বেড়েছে ১৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

সূত্র আরো জানায়, ডলারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করার পাশাপাশি আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ডলারের মূল্যও নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু চাহিদার তুলনায় জোগান না থাকায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওই উদ্যোগ কাজে আসেনি। ডলারের বিক্রয় মূল্য সর্বোচ্চ ৮৩ টাকা নির্ধারণ করে দেয়ার সময়ও অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংক ৮৩ টাকা ৫০ পয়সায় ডলার বিক্রি করতে থাকে। পরবর্তী সময়ে দুই দফায় আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ডলারের ক্রয় ও বিক্রয় মূল্য বাড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রথমে ডলারের সর্বোচ্চ বিক্রয় মূল্য ৮৩ টাকা ৫০ পয়সা ও পরে ৮৩ টাকা ৭০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু গত সপ্তাহে বেসরকারি ব্যাংকগুলো আমদানি পর্যায়ে ডলারের বিক্রয় মূল্য ৮৩ টাকা ৭৫ পয়সা ঘোষণা করছে। অনেক বেসরকারি ব্যাংকই বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ডলারের মূল্য বেশি ঘোষণা করেছে। যদিও ব্যাংকগুলো ঘোষিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামেই ডলার লেনদেন করছে। ডলারের এ মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের আমদানিকারকরা। আমদানি পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তাদেরও বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে।

এদিকে বিদ্যমান ডলার সংকট দেশের অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ বলে মনে করেন ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান। তিনি জানান, চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ আমদানি এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে, সে পরিমাণ রফতানি আয় ও রেমিট্যান্স দেশে আসেনি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংকগুলোয় ডলারের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে যেসব এলসি খোলা হয়েছে, সেগুলো এখন নিষ্পত্তি হচ্ছে। তাতে ডলার সংকট আরো গভীর হচ্ছে। আর বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিদিনই বাজারে ডলার বিক্রি করলেও চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক পর্যায়ে আনতে বেশ কয়েকবার বৈঠক হয়েছে। কিন্তু তার পরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে না। সেজন্য করণীয় বিষয়ে আবারো বসতে হবে।

Leave a Response