Sunday, September 20, 2020
শিক্ষাঙ্গনসারাদেশ

অদম্য দিবা-রাত্রী যেতে চায় অনেক দুর

172views

অদম্য দিবা-রাত্রী যেতে চায় অনেক দুর

নিজস্ব প্রতিবেদক: দিবা-রাত্রি। যমজ বোন। দুর্ভাগ্য দুই বোনেরই। দু’জনই শারিরিক প্রতিবন্ধি। হাঁটতে পারে না ওরা। অন্যের উপর ভর করেই বেঁচে থাকা ওদের। তবে, প্রচন্ড সীমাবদ্ধতাকে জয় করে এবার এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে দুই বোন। রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে মানবিক বিভাগে পরীক্ষা দিয়ে দু’জনই ভালোভাবেই উত্তীর্ণ হয়েছে। ৪ দশমিক ৭৮ পেয়েছে দুই বোন। এর আগে জেএসসি পরীক্ষায় দিবা ও রাত্রী দুই বোনই জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। তারা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চায়। আগামী দিনে চাকুরি করার ইচ্ছা তাদের। কিন্তু কতদুর এগোবে তারা এনিয়ে শংকা কাজ করে সবসময়ই। বাবা আমিনুল ইসলাম চরম অনিশ্চয়তা নিয়েই দুই মেয়েকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন।

২০০৩ সালে বগুড়া সদর থানার বারোপুর এলাকার মা মরিয়ম বেগম ও বাবা আমিনুর ইসলামের ঘরে আশার আলো ছড়িয়ে জন্মগ্রহণ করে দিবা ও রাত্রী। যমজ হওয়ায় বাবা, মা সখ করে মেয়েদের নাম রাখে সুরাইয়া দিবা ও সুমাইয়া রাত্রী। কিছু দিন যেতে না যেতেই দিনের আলো সরিয়ে আমিনুরের পরিবারে রাতের অন্ধকার নেমে আসে। দিবা রাত্রি বড় হওয়ার সাথে সাথে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাদের হাত, পা কাজ করে না। দুই বোনকে নিয়ে পরিবারের সবাই আশা ছাড়লেও আশা ছাড়েনি বাবা মা। স্থানীয় একটি সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয় তাদের। মা কোলে করে স্কুলের ব্রেঞ্চে বসিয়ে আসেন। স্কুল শেষে আবার কোলে করে পর্যায় ক্রমে বাড়ি নিয়ে আসেন দুই মেয়েকে। কখনো মায়ের কোলে কখনো বাবার কোলে । এভাবেই শুরু দিবা রাত্রির স্কুল জীবন।

এখনো তারা হাঁটতে পারে না। দুই হাতেও স্বাভাবিক কাজ করে না। সেজন্য কি থেমে গেছে দিবা রাত্রীর জীবন? থেমে থাকেনি। স্কুলের শিক্ষক এবং মা বাবার তদারকিতে দ্রুতই পাঠের পড়া আয়ত্ত করে দুই বোন। প্রাইমারিতে ক্রমান্বয়েই ভালো ফলাফল করে দিবা রাত্রি। প্রাইমারির গন্ডি পেরিয়ে ভর্তি হয় বাড়ি থেকে হাফ কিলোমিটার দূরের আলহাজ্জ্ব আব্দুল কমির বালিকা বিদ্যালয়ে।

প্রত্যেক ক্লাসের বার্ষিক পরীক্ষায় তুলনামূলক ভালো ফলাফল করে তারা। এজন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পাশাপাশি মায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি। ২০১৮ সালে জেএসসি পরীক্ষায় তারা আলহাজ্জ্ব আব্দুল কমির বালিকা বিদ্যালয় থেকে অংশ নিয়ে জিপিয়ে ৫ পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়। ওই বিদ্যালয় থেকে সেবার মোট ৫৬জন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। ২০জন পায় জিপিএ ৫। তার মধ্যেই জায়গা করে নেয় দুই বোন দিবা ও রাত্রী।

এবার ঐ স্কুল থেকেই অংশ নিয়েছিলো এসএসসি পরীক্ষায়। দিবা রাত্রী আবারো উত্তীর্ণ হয়েছে। ৪ দশমিক ৭৮ জিপিএ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে তারা। দিবা , রাত্রীর আশা ছিলো আরেকটু ভালো করার। জিপিএ ৫ পাওয়ার আশা ছিলো। হয়নি।

দিবা ও রাত্রীর সাথে কথা বললে তারা জানায়, বেশি খুশি হতে পারিনি। আরেকটু ভালো করার আশা করছিলাম। তারা জানায়, ‘লেখাপড়া চালিয়ে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে। তারপর শিক্ষা জীবন শেষে বড় সরকারি কর্মকর্তা হবে। দেশের জন্য মানুষের জন্য কাজ করতে চায় তারা।’

দিবা রাত্রীর মা মরিয়ম ইসলাম বলেন, জন্মের পর থেকেই ওদের দুইজনকে অনেক কষ্ট করে এই পর্যন্ত এনেছি। পড়াশুনার প্রতি ওদের অদম্য ইচ্ছা দেখে বসে থাকতে পারিনি। যত কষ্টই হোক ওদের লক্ষ্যে না পৌছা পর্যন্ত এই যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন বলে তিনি জানান।

দিবা রাত্রীর বাবা স্থানীয় বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আমিনুর ইসলাম সুইট বলেন, মেয়ে দুটো শারীরীক প্রতিবন্ধি হলেও ওদের মেধা প্রখর। ২০১৬ সালে সারা দেশে প্রতিবন্ধীদের একটি প্রতিযোগীতায় সুরাইয়া রাত্রী ছবি আঁকায় প্রথম হয়। উল্লেখ্য রাত্রীর হাতে পেন্সিল তুলি ধরার ক্ষমতা নেই। তার পরেও দীর্ঘ সময় ধরে আস্তে আস্তে ওই ছবিটি এঁকেছিলো। ঐ সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১লাখ টাকার প্রথম পুরষ্কার রাত্রীর হাতে তুলে দেন। আমিনুল ইসলাম বলেন, দুই বোনই হাঁটতে পারে না। ওদেরকে কোলে করে ক্লাসে নিয়ে যেতে হয়। ওর মা এবং আমি দুজনই চেষ্টা করেছি ওদের পড়াশোনার জন্য। আমাদের কষ্ট হচ্ছে এটা সত্য কিন্তু আমরা থামতে চাইনা। ওরা যতদূর যেতে পারবে আমরা ওদের জন্য চেষ্টা করবো। এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে খুশি হলেও আগামী দিনের পড়াশোনা নিয়ে চিন্তিত বাবা।

তিনি বলেন, হাইস্কুলটা ছিলো বাড়ির কাছাকাছি কষ্ট করে হলেও নিয়ে গেছি। কিন্তু কলেজ বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে। তাদের কিভাবে নিয়ে যাবো সেটি একটা চিন্তার। আমিনুল ইসলাম বলেন, মেয়েদের যে পয়েন্ট রয়েছে তাতে সরকারি আজিজুল হক কলেজে ভর্তির সুযোগ পাবার কথা। কিন্তু দূরত্বের কারণে আমরা সেখানে পড়াতে পারবোনা। বাড়ি থেকে প্রায় ৩কিলোমিটার দুরের একটি কলেজে ভর্তি করাতে চাই। তিনি বলেন, মেয়েদের পড়াশোনার ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আশপাশের মানুষের সহযোগিতা আছে। শুভকামনা আছে। আগামীতেও যাতে এমন থাকে সেটিই চাওয়া। এছাড়া সরকারীভাবেও তাদের প্রতি সুদৃষ্টি থাকলে ওরা আরো অনেক দূরই এগিয়ে যাবে, প্রত্যাশা বাবা মায়ের।

রাজশাহী শিক্ষাবোর্ডের সচিব ড. মোয়াজ্জেম হোসেন অদম্য দুই বোনের এ সফল্যের জন্য তাদের শুভকামনা জানিয়েছেন। আগামী দিনে বোর্ডের পক্ষ থেকে তাদের কোন ধরনের সহায়াতা দেয়ার সুযোগ থাকলে তা করা হবে বলে জানান তিনি।

Leave a Response